বিসংবাদ

না-সংবাদ


ছোটোবেলায় শোনা একটা কণ্ঠস্বর এখনো মাঝে মাঝে তাড়া করে স্মৃতিতে – “আকাশবাণী কলকাতা, শুরু করছি আজকের সংবাদপরিক্রমা”। সমস্ত জাতীয় আন্তর্জাতিক খবরের একটা সহজপাচ্য বটিকা বানিয়ে গিলিয়ে দেয়া হত শ্রোতাদের ওই দশ মিনিটের অনুষ্ঠানে। সারাদিন যাঁরা খবর শোনার সময় পেতেন না – তখন তো আবার খবর দেখার কোনো উপায় ছিল না, সে এল আরো অনেক পরে – তাঁরা সারাদিনের আপডেটের একটা ক্যাপসুল গিলে জল খেয়ে শুয়ে পড়তেন, হয়তো তাঁদের কেউ কেউ পরের দিন নিজেই খবর হয়ে যাবেন। এইটা যে সময়ের কথা, তখন বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ চলছে, শেষের দিকে, এবং আমরা যে অঞ্চলে বসে আছি তখন সেটা ছিল ভারতীয় বাহিনীর বাংলাদেশ যাবার অন্যতম রুট। ফলে ট্যাঙ্ক কেমন দেখতে হয়, বা চাঁদমারির সময়ে লাইট মেশিন গানের আওয়াজ দূর থেকে কেমন দুঃস্বপ্নের মতো শোনায় – সেই সব স্মৃতির টুকরোটাকরা মিশে আছে সংবাদপরিক্রমায় – এবং দেবদুলালবাবুর ভারী কণ্ঠস্বরের সঙ্গে। তার সঙ্গে আরো মিশে যেত সারাদিন ধরে পানাগড় এয়ারবেস থেকে ওড়া মহড়ারত ফাইটার প্লেনের আওয়াজ। সে খুব সুখের দিন ছিলনা এমন কথা তবু বলা যাবেনা। কারণ মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ আঘাত তখনো আমাদের ঘাড়ে পড়েনি।
মুক্তিযুদ্ধ এপার বাংলাকেও কতটা ধ্বস্ত করেছিল তার খতিয়ান আমরা পেয়েছি অনেক পরে, যখন ক্ষত প্রায় সারিয়ে তোলা হয়েছে। হাজারে হাজারে শরণার্থী উদ্বাস্তুরা যখন আবার গর্ববোধ করার মত আত্মপরিচয় খুঁজে পেয়েছে, রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করতে শুরু করেছে – এবং যখন আমরা ’৭১-এর সাহিত্য নামে একগুচ্ছ মণিমাণিক্য চিহ্নিত করে ফেলেছি – তখন। মাথার মধ্যে গণিত গজ্‌গজ্‌ করতে থাকলে সংবাদের মূল্য নির্ধারণ করা হয় সম্ভাব্যতার নিরিখে। যে ঘটনার সম্ভাব্যতা যত কম তার সংবাদমূল্য ততো বেশী। অর্থাৎ আজ সকালে সূর্য পূর্বদিকে উদিত হয়েছে – এ খবরটা দেবার জন্য কোন সংবাদপাঠক গলা কাঁপাবেন না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে গুলি করে হত্যা করেছেন তাঁরই ব্যক্তিগত দেহরক্ষী – এটা নিঃসন্দেহে সেই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় খবর। খবর বাছাইয়ের এরকম একটা পদ্ধতি সমস্ত সম্পাদকীয় ডেস্কে সবসময় চলতে থাকে। খবরের তাৎক্ষণিক মূল্য কমিয়ে আনার চেষ্টা চলতে থাকে অবিরাম – ক্রমাগত বিশ্লেষণ, সমীক্ষা, এবং ভবিষ্যৎ দর্শনের মাধ্যমে। কোন ঝানু সাংবাদিককে কোন তাজা খবর দিলে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হয় – ‘আরে এ তো হবারই ছিল’। হয়তো ছিল। কার্য-কারণ সম্পর্কও নিশ্চয়ই কোথাও একটা ছিল, তা না হলে ঘটল কি করে ঘটনাটা। সেই অর্থে অমৃতসর স্বর্ণমন্দিরে সেনা প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল শ্রীমতী গান্ধীর ভবিষ্যৎ। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই causality-র পুরো শৃঙ্খলটা জানা ছিল কি সেই মুহূর্তে? জানলে নিরাপত্তা আধিকারিকদের জানানো হয়নি কেন? জানা ছিলনা বলেই তো ওটা তখন সংবাদ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছিল। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল। যখন ঘটনা ঘটছে, তখন আন্দাজ করা সম্ভব হয়নি যে এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের জনগণনায়, জনমানসে, এবং রাজনীতিতে কি বিশাল প্রভাব পড়তে চলেছে। ’৪৭-এর দেশভাগের পর থেকেই শরণার্থীর চাপ বাড়ছিল এপার বাংলায়। বেশীর ভাগ হিন্দু, কিন্তু অল্প কিছু মুসলমান শরণার্থীও, তখন এ-ঘাটে ও-ঘাটে ধাক্কা খেতে খেতে ভেসে বেড়াচ্ছে। কখনো বাংলা, কখনো আসাম। ১৯৫৮ সালে শুরু হয় দণ্ডকারণ্য প্রজেক্ট। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হয় ভারতের একেবারে কেন্দ্রের কাছে, পূর্বতন মধ্যপ্রদেশে। কিন্তু বাঙালী শরণার্থীরা চায় বাংলার মাটিতেই থাকতে, খুবই সঙ্গত কারণে। তাদের সে চাওয়াটাতে আরো ধোঁয়া দেয় তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির দায়িত্বজ্ঞানহীন নির্বাচনী প্রচার। সে প্রচারের দৌলতে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে বটে – কিন্তু পরবর্তীতে মরিচঝাঁপিও অনিবার্য হয়ে পড়ে। আসলে – উদ্বাস্তুদের সংখ্যাটা যে ঠিক কতো সেটাই কারো ধারণায় ছিলনা। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৈরী হল একটি চিরন্তন ক্ষত – যে ক্ষত বারেবারেই মনে হয় শুকিয়ে এসেছে, অথচ ঠিক কেউ না কেউ খুঁচিয়ে তোলে ঘা। ’৪৬-এর দাঙ্গা থেকে শুরু করে ’৭৯-র মরিচঝাঁপি পর্য্যন্ত – কোনটা যে খবর আর কোনটা নয়, হতে পারে না, সে হিসেবটাই পুরো গুলিয়ে গেল। সম্ভাব্যতা-অসম্ভাব্যতার সীমারেখায় দুলতে থাকলো সবকিছু।
এর মধ্যে ঘটতে থেকেছে আরো অনেক ঘটনা। ’৬৪-তে প্রথমবার ভাগ হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি – আদর্শগত কারণে যতটা তার চেয়ে অনেক বেশী স্ট্র্যাটেজিগত কারণে। ’৬৭ সালে পার্টি আবার ভাগ হয় – আবারও সেই লড়াইয়ের কৌশলগত কারণেই। লড়াইটা আদতে কার সঙ্গে সেটাই কতটা স্পষ্ট ছিল কোনো পক্ষের কাছেই, সেটাও খুব একটা গৌরবের ইতিহাস নয়। ভারতীয় সমাজ শ্রেণীবিভক্ত তো বটেই – কিন্তু সে বিভাজনকে চাপা দেবার জন্যে আরো বহুস্তরীয় বিভাজনের খেলা চলে। জাতিভেদ, ধর্ম, লিঙ্গ ইত্যাদি। এত সব শ্রেণীশত্রুদের মধ্যে ঠিক কার বিরুদ্ধে কখন কিভাবে লড়াই হবে – এটা বুঝতে বুঝতেই পৃথিবীজুড়ে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের দিন শুরু হয়ে গেল। এবং তার সঙ্গেই শুরু হলো নির্বাচিত খবর এবং না-খবরের প্রতিযোগিতা। যাকে এখন বলা হয় alt-fact, fake news ইত্যাদি। সম্ভাব্যতার হিসেবটা আর বাস্তব জগতের চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইলো না। মানে চোখে দেখে উল্টোটা মনে হলেও – যেটাকে খবরের তক্‌মা দেয়া হয়েছে সেটাই খবর। গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি পুরোপুরি রাজনৈতিক। চীন-রাশিয়া-কোরিয়া-কিউবা-আফ্রিকা তো বটেই, এমনকি ঘরের পাশে ধুলোগড় মেটিয়াবুরুজ থেকেও একই মুহূর্তে পরস্পর বিরোধী দু’রকম খবর আসতে থাকে – এবং কি আশ্চর্য, দুটোকেই বেশ সম্ভাব্য বলে মনে হয়। সেই ঝানু সাংবাদিক মহোদয়ের দেখা পাচ্ছিনা অনেক দিন, ধরতে পারলে একটু কলার ধরার ইচ্ছে ছিলো।
ঠিক সেইরকম এক গ্রীষ্মের দুপুরে সুতরাং, সংবাদপরিক্রমার দিন শেষ। সংবাদের সহজপাচ্য বটিকাটির উৎপাদন বন্ধ। অথবা হয়তো খবরই নেই আজকাল, শুধুই বটিকা। কানের পাশে টিভি, রেডিও, ইন্টারনেট সব একসঙ্গে চালিয়ে রেখেও যদি খবরের কূল করতে না পারা যায় – তাহলে একবার একটু না-নিরপেক্ষ হবার চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। খবর থেকে না-খবরকে ঝাড়াইবাছাই করতে হয়তো একটু সুবিধে হবে। আমরা অন্তত সগর্বে বলি – “আমরা নিরপেক্ষ নই, আমরা মানুষের পক্ষে”।


This section is not open for all. Please mail to info@chaityapatrika.com and ask for password.
RegionalNationalInternational