চিত্রকরঃ ছবি দেখা এবং দেখানো


সিনেমা রিভিউ সাধারণতঃ আমি লিখিনা। এটাও লিখবো কি না সেই নিয়ে একটু দ্বিধাদ্বন্দ্ব ইত্যাদি ছিল এবং এখনও আছে। কিন্তু লিখতে শুরু করলাম মূলতঃ দুটো কারণে। প্রথমতঃ বাংলা ভাষায় এরকম ছবি হয়েছে কি না আগে, আমার জানা নেই। দ্বিতীয়তঃ শান্তিনিকেতনে থাকার সুবাদে, এই ছবির যে দার্শনিক পটভূমিকা, তার সঙ্গে আমার পরিচয় ওতপ্রোত। ছবিটা ভারতের কোন থিয়েটারে এখনো প্রদর্শন করা হয়নি, আগামীতেও খুব ব্যাপক হারে হবে তারও কোন সম্ভাবনা এখনও দেখা যাচ্ছে না। তবে অনলাইন রিলিজ হয়েছে। পয়সা দিয়ে কিনে নিজের গৃহকোণটির আরামে বসে ছবিটা দেখা যাচ্ছে, দেখতে চাইলে। এই ধরণের রিলিজ বাংলায় এই প্রথম নয়, বিগত দু’তিন বছরের মধ্যে আরো কিছু ছবি এভাবে দেখানো হয়েছে। আমার নিজের একটা ছবিও মোটামুটি এইভাবেই কিছু লোকের কাছে পৌঁছে দেওয়া গেছিল কয়েক বছর আগে। ছবির ডিস্ট্রিবিউশন যাঁদের ব্যবসা – এটা মূলতঃ তাঁদের ব্যর্থতা, যে কোন ছবির দর্শক কারা এই মূল্যায়ন করতে তাঁরা আজও শেখেননি – মোটামুটি সবকিছুকেই একটি বা দুটি ফর্মুলায় ঢেলে দিতে চান। মুড়ি মুড়কির একদর না হলেও, মুড়ি আর মুড়কি ছাড়া আর কিছু তাঁরা চেনেন না। চপ-ফুলুরি-ঘুগনি-বোঁদেও না, বিরিয়ানি-র তো কথাই নেই। হয় মুড়ি, নয় মুড়কি। বড়বড় চার অক্ষরের/মাত্রার শব্দ আছে বটে, মূলধারা আর অন্যধারা – তবে কিনা চার অক্ষর তো!

শৈবাল মিত্রের চিত্রকর ঠিক বিরিয়ানি না হলেও, মুড়িমুড়কিও ঠিক নয়। শান্তিনিকেতনের আলমা ম্যাটার বাদ দিলেও, ভারতীয় দৃশ্যকলা নিয়ে যাঁদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ আছে, অথবা যাঁরা সেই ঐতিহ্যের অংশীদার বলে নিজেদের মনে করেন, তাঁদের আবশ্যিক ভাবেই এই ছবি দেখা উচিৎ। সহমত না-ই হতে পারেন, বস্তুত সহমত হতে অথবা না হতে গেলে যে সুস্পষ্ট মতটিকে থাকতে হয় পূর্বশর্ত হিসেবে, সেটাই এই ছবিতে প্রায় অনুপস্থিত। থিসিস আছে, অ্যান্টিথিসিস আছে, কিন্তু সিন্থেসিসের বদলে আছে সংশয়। একটি দুটি সিম্বলিক মুহূর্ত ছাড়া সিন্থেসিসের তেমন কোন বীজ উদ্‌গত হয়নি বলেই অন্তত আমার মনে হয়েছে। সিন্থেসিস নেই তাতে কি? সাংখ্যদর্শনেও নেই। ভারতীয় দর্শনের আকরগ্রন্থগুলির প্রায় কোথাও নেই। প্রকৃত অর্থে ডায়ালেক্টিক্‌স ভারতীয় মেথড নয়। আমাদের মেথড বরং ডায়ালজিক্‌স। একাধিক বিরুদ্ধমতের মধ্যে অনন্ত সংলাপ। এবং তার মধ্যেই ‘যত মত তত পথ’-এর সাধনা। সেদিক থেকে দেখলে এ ছবি আরো অনেক ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ ছবির তুলনায় অনেক বেশী ভারতীয়।

মনে পড়লো, খুব ছোটো ছিলাম যখন, আমাকে দৃশ্যশিল্পের পথে আকৃষ্ট যিনি করেছিলেন তাঁর নাম ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্ম্মন। কলাভবনের প্রথম অধ্যক্ষ, যিনি আবার ব্রহ্মবিদ্যালয়ের প্রথম পাঁচজন ছাত্রের মধ্যে একজনও বটে। শান্তিনিকেতনে তখন যে বাড়ীতে আমরা থাকতাম, তার ঠিক সামনে দিয়ে অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক শিল্পী ধীরেন্দ্রনাথ টুক্‌টুক করে একটা লাঠি হাতে নিয়ে যেতেন সূর্যোদয় দেখতে। বোলপুর থেকে প্রান্তিক যাবার যে রেলপথ, তার পাশে, প্রান্তিক স্টেশনের কাছাকাছি, পূর্বপল্লীর একেবারে উত্তর প্রান্তে একটা কাজুগাছের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেন সূর্য ওঠার ঠিক আগে। কারুকাজ করা হাতের লাঠিটিতে ভর দিয়ে দাঁড়াতেন বৈতালিকে দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে। চৈনিক সেই লাঠিটি বড় প্রিয় ছিল তাঁর। তখন রেললাইনের ধারে এত শহর গজায়নি। নীরব হাহাকারের মতো সেই প্রান্তরে পুবের সীমানায় কিছু ধূসর গাছের সারি। সে দিকে তাকিয়ে থাকতেন চুপ করে। সূর্য উঠলে, আবার টুকটুক করে ফিরে আসতেন অবনপল্লীর বাড়িতে। আমি তখনও শান্তিনিকেতনের ছাত্র নই। অন্য স্কুলে পড়ি। ছুটিছাটায় শান্তিনিকেতন গেলে ভোরবেলায় আমি হতাম সঙ্গী। ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ-র পৌত্র বিবেককৃষ্ণ আমার সমবয়সী বন্ধু, আমিও তাই দাদু বলতাম। দাদুকে সামনের রাস্তায় দেখলে তুড়ুক তুড়ুক বেরিয়ে আমি সঙ্গ নিতাম। এই সঙ্গটুকু বিবেকও পায়নি, কারণ ও তখন চলে গেছে বা যাচ্ছে সকাল বেলার ক্লাস করতে। উদীয়মান সূর্য লাল নয়, বরং হলুদ এবং কমলা – এটা তখনই প্রথম দেখতে শিখেছিলাম। এছাড়াও হত রঙ নিয়ে আরো কত কথা। চাঁদের আলোয় সব গাছই দেখা যায়, কিন্তু যত উজ্জ্বল পূর্ণিমাই হোক, পাতার সবুজ রংটি দেখা যায়না, সবই ধূসর –এটাও তখনই দেখতে শিখেছিলাম। আরো হত চীন জাপান অর্থাৎ দূরপ্রাচ্যের বৌদ্ধবলয়ের শিল্পের নানা কথা। জেন-তাও ইত্যাদি জেনেছি অনেক পরে কিন্তু সঙ্গীতের সারেগামা-র মতো ওদের প্রত্যেকটি আঁচড়ের নিজস্ব গরিমা এবং অর্থ আছে – অন্তত ওরা তাই মনে করে – এবং সেভাবেই বিন্যস্ত করে ছবি, এটাও তখন আমার কানে এসেছিল। কিচ্ছু বুঝিনি তখন, কিন্তু বিস্মিত হতে শিখেছিলাম। বৈচিত্র্য তার নিজের জায়গাতেই মহান, এই বোধটুকু তৈরী হয়েছিল। বিবেককৃষ্ণও ভীষণ সংবেদনশীল এবং শক্তিশালী শিল্পী। কিন্তু সে এখন তার পেশাদারী শৈল্পিক পরিমণ্ডল ছেড়ে আনন্দ লী তানের বাড়িতে খাবারের রেস্তরাঁ চালায়। বাজারের মুড়িমুড়কির দাবীর কাছে মাথা নত করবেনা বলে। দেববর্ম্মন-রা উপজাতি বলে জানি, ক্ষত্রিয় কি না জানিনা। কিন্তু বিবেক সেই ইস্কুলবেলা থেকেই ক্ষত্রিয় বলে একটা অপ্রচ্ছন্ন অহংকারে ভুগত – মাথা নত করেনি। ক্ষত্রিয় হ’ক বা না হ’ক, মাথা নত না করাটা শিল্পীর ধর্মের মধ্যে পড়ে।

এই অপ্রাসঙ্গিক গল্পের অবতারণা করলাম শুধু ওই শেষ কথাটির জন্যে নয়। চিত্রকর ছবির মধ্যে একজন শিল্পীর সমস্ত শরীর দিয়ে সূর্যোদয় অনুভব করার মধ্যেও আমি হঠাৎ যেন কলাভবনের সেই ঐতিহ্যটুকুর আবেশ পেলাম। আজকের কোলাহলভবন তাকে এখনও হারিয়ে দিতে পারেনি। অথবা সত্যিই পারেনি কি? কাল্পনিক বিজন বোসের সঙ্গেই কি সেই ঐতিহ্যেরও অবাঞ্ছিত পরিসমাপ্তি ঘটল?

নাঃ, গল্পের একটু আভাস এবার না দিলেই নয়। বিজ্ঞাপনে এবং ট্রেলারে চিত্রকর ছবির মূল চরিত্র একজন কাল্পনিক শিল্পী বিজন বোস। অভিনেতা ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়ের যে রূপায়ণ করা হয়েছে তাতে শিল্পী বিনোদবিহারীর কথা মনে আসা স্বাভাবিক, এবং বিজন বোসের কাজ বলেও বিনোদবিহারীর কাজই দেখানো হয়েছে সারা ছবি জুড়ে। যদিও ছবিতে জোর করে এটা অস্বীকার করা হয়েছে, এমনকি বিজন বোসকে দিয়েই বিনোদ-দার নামও উচ্চারণ করানো হয়েছে সমসাময়িক বলে, কিন্তু তাতে বরং মিলটাই আরো বেশী করে আন্ডারলাইন করা হয়েছে। এই অস্বীকারের দর্শন নিয়ে পরে কথা বলছি। অমিলও আছে। বিনোদবিহারীর জীবদ্দশায় ভারতে শিল্পের এমন বাজার তৈরী হয়নি যাতে একটা বিশাল অঙ্কের টাকা নেওয়া বা প্রত্যাখ্যান করার প্রশ্ন উঠতে পারে। সে প্রশ্ন এসেছিল শেষজীবনে অন্ধ হয়ে যাওয়া আরেক শিল্পীর জীবনে, মার্ক রথকো। শিল্পের ইতিহাস সম্পর্কে যাঁরা একটুও ওয়াকিফ্‌হাল – তাঁরা সে গল্প জানেন। সে কথা থাক। কিন্তু আমার কাছে ছবির মূল চরিত্র তিথি (অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়)। একজন অসহায় কিন্তু সংবেদনশীল মানুষ, যে শিল্পের একটা অধরা ছায়া-ছায়া আদর্শের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে। তার পরিপ্রেক্ষিত ক্রমাগত বদলে যাচ্ছে, এবং সে বদল তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিছুই যেন তার হাতে নয়। পলাশের ব্যবসায়িক গ্যালারী, অনেক টাকা যার ভাড়া, সে ভাড়া মেটাতে না পারা, একটাও ছবি বিক্রি না হওয়ার যন্ত্রণা অথবা বিড়ম্বনা, ফলতঃ সন্তানের মতো যে সৃষ্টি সে সব আটকে থাকা গ্যালারীতে, নিজের সঙ্গে অনেক স্নায়ুযুদ্ধ করে ড্রাগ ছাড়তে পারা তিথির এটা শহুরে পারসপেক্টিভ। এখান থেকে এক ধাক্কায়, বস্তুত পুঁজিবাদী চক্রান্তের শিকার হয়ে তিথি হঠাৎ এসে পড়লো সম্পূর্ণ অপরিচিত এক প্রান্তরে, এক রাত হয়তো স্টেশনেই কাটালো কারণ তার গন্তব্যের হদিশ কেউ তাকে দিতে পারলো না, কি ভাবে তার উল্লেখ গল্পে নেই। রূক্ষ্ম কিন্তু উর্বর সে প্রান্তর, এবং অবশেষে খোঁজ পাওয়া গেল সেই গন্তব্যের, রূক্ষ্ম কিন্তু সৃজনশীল এক বৃদ্ধ শিল্পী বিজন বোস যাকে শহুরে তিথির এক আধপাগলা বুড়ো ছাড়া আর কিছুই মনে হবার কথা নয়। তিথির জানা শহুরে চাতুর্য এবং শিল্পবোধের সঙ্গে, যার অন্যতম উপকরণ সেই চাতুর্যই, এই বৃদ্ধের কথাবার্তার ঘোর বিরোধ। তিথি থাকবে কি যাবে এই দ্বন্দ্বে যখন দুই পক্ষই ভুগতে থাকে, তারই মধ্যে শুরু হয় আসল কাজ। ব্রাউন পেপার ভাঁজ করে লে আউট শুরু হয়। এই দৃশ্যটি ছবির কেন্দ্রীয় মুহূর্ত এবং ধৃতিমান যে সত্যিই কতো বড়ো মাপের অভিনেতা সেটা এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। সহকারী তিথিকে অভিনয়েও স্রেফ সহকারীই মনে হয়েছে। শ্যাম না থাকলে যেমন কিছু ইতরবিশেষ হতো না, তিথিও যেন তাই। যে বাচনভঙ্গি তিথির কাছে আশা করা হয়েছে, অর্পিতা তাতে ততোটা অভ্যস্ত নন, সেটা বড় কানে লাগার মতো।

এর পর থেকে শুরু হয় দার্শনিক সংঘাত এবং স্ববিরোধ। বিনোদবিহারীর, থুড়ি বিজন বোসের কাজে সেই সব সাধারণ মানুষের কথা উঠে আসে যারা কৃষিজীবি, শ্রমজীবি, অথচ তাদের নিয়ে যে শিল্পকীর্তি গড়ে ওঠে সে শিল্প থাকবে মন্দিরে, হাই পেডেস্টালে। অন্যদিকে পোস্ট-মডার্ন বাকচাতুরীতে অভিভূত তিথি যে শিল্পের কথা বলে সে শিল্প আবশ্যিক ভাবে তাৎক্ষণিক, অন্তত সমকালের বাইরে তার অস্তিত্ব শিল্পী নিজেই স্বীকার করেন না, সে শিল্পের অবস্থান হাটেবাজারে, agora-য়, কিন্তু তার ভাষা এবং চিত্রকল্প সাধারণ মানুষের ইন্টেলেক্টের বাইরে, দূরাগত নক্ষত্রের মতো। এই দুয়ের মধ্যে কোন যৌক্তিক বিরোধ নেই, বস্তুতঃ একটির অবশ্যম্ভাবী পরিণতি অন্যটি, কিন্তু বিরোধ আছে রাজনৈতিক অবস্থানের। এরা মিলতে পারে শুধু রবীন্দ্রনাথের গানের কথায় ও সুরে! প্রশ্ন উঠতে পারে আমরা কি রাজনীতির বিপরীত স্রোতে যাচ্ছি, কানকো ঠেলে চলা বর্ষার কইমাছের মতো? উত্তর অবশ্য সদর্থক, গলা চিরে চেঁচিয়ে ‘হ্যাঁ’! মোদী-ট্রাম্প-ব্রেক্সিট-আইসিসের জমানায় আমরা বলতেই পারি যে রাজনৈতিক বিবর্তনের যে পথটিকে আমরা ধ্রুপদী স্বাভাবিকত্ব আরোপ করতে শিখেছিলাম, আমরা এখন ঠিক তার বিপ্রতীপ কার্ভেই আছি। এই বিপ্রতীপত্ব সাময়িক না এটাই শাশ্বত, তার জবাব পরিচালক নিজের মতো করে ছবিতে দিয়েছেন – তবে আলোচনাটা আরেকটু স্পষ্টও হতে পারতো হয়তো। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

এই দু’জন ছাড়া ছবিতে আরও চারটি অর্ধ-চরিত্র আছে, নেহাতই হাফ-টিকিট। শ্যাম, হেমেন, পলাশ, আর রামানন্দ। অর্ধ-চরিত্র এই কারণে যে ছবিতে এদের কোন ইতিহাস নেই, ভূগোল নেই, ভূত নেই, ভবিষ্যতও নেই। কারো কোন আঞ্চলিক উচ্চারণের টান নেই। তারা শুধু ছবির ঘটমান কালটুকুর মধ্যেই অস্তিত্বশীল, তার বাইরে নয়। বিশেষতঃ রামানন্দ একেবারেই কাট-আউট চরিত্র, প্রায় দ্বিমাত্রিক। রামানন্দ আর পলাশ মিলিয়ে একটা চরিত্র হতে পারতো হয়তো, যেমন শ্যাম আর হেমেন দুই গুণমুগ্ধ ভক্ত প্রায় একই রকম, কত্তামশাইয়ের জন্য জান কবুল।

এই ইতিহাসহীনতা ছবিটির একটি বড় বৈশিষ্ট্য। শিল্পীর জীবন নিয়ে ছবি দেখতে বসলে অবশ্যম্ভাবী ভাবে মনে পড়ে যে সব ছবির কথা, তার মধ্যে একটি নিঃসন্দেহে Frida। যেমন করে বিনোদবিহারীর ক্ষেত্রে আমরা এক বিপন্ন বিস্ময়ের মুখোমুখি হই, “কী করে করেন!” – ঠিক তেমন করেই ফ্রিদা কার্লো সম্পূর্ণ পঙ্গু অবস্থায় কি করে ওই সব ছবি এঁকে গেছেন সে-ও এক দুরতিক্রম্য রহস্য। ব্যক্তিগত জীবনের উত্থান-পতন, উত্থান কম পতন বেশী, আক্ষরিক অর্থে – অদ্ভূত দাম্পত্য, পালিয়ে বেড়ানো ট্রটস্কি-র সঙ্গে এক বিচিত্র আত্মীয়তাবোধ, এ সব ছাড়িয়ে ফ্রিদাকে তবু সম্পূর্ণরূপে ইতিহাসে সম্পৃক্ত বলে মনে হয়, কারণ সমসাময়িক রাজনীতির সঙ্গে ফ্রিদার যোগাযোগ কখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি। ওই আধা-বিপ্লবী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে না দেখলে কিন্তু ফ্রিদাকে বোঝার ন্যূনতম অবকাশটুকুও থাকতোনা। কিন্তু চিত্রকর ছবিতে সেই সমস্যাটা তৈরী করে দিলো ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্নতা, জবরদস্তি উপড়ে এনে একটা লোককে আরেকটা লোক বলে চালানোর চেষ্টা। অপচেষ্টা বলাই ভালো। কারণ যে দর্শক বিনোদ-দার সঙ্গে এবং তাঁর কাজের সঙ্গে একটু হলেও পরিচিত, তার কাছে বিজন বোসই বিনোদবিহারী। মাঝের থেকে ইতিহাস হারিয়ে ফেলায়, তাঁর শিল্পদর্শনের একটা স্ববিরোধের মীমাংসা হলোনা – হাটেবাজারে দেখা সাধারণ মানুষগুলোর গল্প ওই হাই পেডেস্টালে তুলতে যাবো কোন দুঃখে! এবং তারপরেও কেন Art is dead কথাটা শুনলে অমন ক্ষেপে উঠবো! রঙ ব্যবহার নিয়ে তর্কটা একটা মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের আকার নিলো, কিন্তু মনস্তত্ত্বের প্রসঙ্গ একবারও উঠে এলোনা। কালো রঙ তথা অন্ধকারে ভীতি আমাদের মধ্যে জেনেটিক্যালি এন্‌কোডেড, এটা শিল্পের দোহাই দিয়ে অস্বীকার করা যায় কি? তবে কিনা – দর্শক যদি পরিচালককে এমন প্রশ্নও করে বসে ‘আপনি আমার মতামতকে গুরুত্ব দেন?’, তাহলে পরিচালকের কাছ থেকেও ওই একই টাং-ইন-চিক উত্তর আসবে – ‘একেবারেই না’।

যদি একটু কৃৎকৌশলের দিক থেকে ছবিটা দেখা হয়, তাহলে তিনটে জিনিস চোখ এড়িয়ে যাবার উপায় নেই। প্রথম, সোর্স লাইটিং-এর ব্যবহার বেশ ভালো, বাংলা ছবির অনেক পরিচালকের কাছে বিষয়টা শিক্ষণীয়। অনেক শটেই সত্যিসত্যিই সোর্স লাইট ছাড়া কিছু ব্যবহার হয়নি বলে এটা একটা অন্য মাত্রা পেয়েছে। আউটডোর শটেও এমনকি রিফ্লেক্টরও বোধহয় ছিলনা অনেক ক্ষেত্রেই। সেদিক থেকে – ছবি কম বাজেটেই হওয়া ভালো, বাজেটের অপব্যবহার অন্তত হয়না। দ্বিতীয়ত, ক্যামেরা পজিশন। এমনিতেই আমি ব্যক্তিগত ভাবে এই অভিনেতার আইলেভেলের দু’ফিট ওপরে ক্যামেরা বসিয়ে ক্রমাগত ঐ কোণটাই ব্যবহার করে যাবার বিরোধী। একটু লং শট হলেই দর্শকের নিজেকে দেয়ালের টিকটিকি মনে হতে বাধ্য। গোটা ছবিতে ক্যামেরা প্রায় কোথাও উল্লম্ব ভাবে মুভ করেনি। প্রায় কোথাও কোন ক্রেন শট নেই। যদিচ ভীষণ দরকার ছিল ক্রেন, বিশেষ করে দুটি দৃশ্যে, কাজ শুরু করার সময়ে, এবং তিনজনে মিলে গুরুদেবের গানে মিশে যাবার সময়ে। তিথি এবং বিজন বোসের প্রথম সাক্ষাৎকারের দৃশ্যে একটু ওয়াইড লেন্সে মাল্টিপ্‌ল ফোকাসিং কি করা যেত? জানিনা। তৃতীয়ত, কম্পোজিশান। একাধিক চরিত্র ফ্রেমে থাকলেই কেমন যেন চরিত্রদুটির সংযোগরেখার সঙ্গে লম্বভাবে বসছে ক্যামেরা। ফলে সরলরৈখিক বিন্যাস হয়ে যাচ্ছে, দুটি চরিত্রই একই তলে অবস্থিত বলে মনে হচ্ছে, দূরত্ববোধটা হারিয়ে যাচ্ছে। লো বাজেটের প্রভাব কি? শ্যুটিং স্পেস, বেশী লেন্স না থাকা ইত্যাদি? জানি না।

নাকি এই ডেপ্‌থ না দেখানোর প্রয়াসটা সচেতন? শিল্পদর্শনের বেলায় যেমন করা হলো? ভারতীয় ডায়ালজিক্স? পাশাপাশি দু’জনের মতামত তুলনামূলক ট্যাবুলার আকারে ফেলে দেওয়া হলো, কোন মন্তব্য, টিকাটীপ্পনী ছাড়াই? এর উত্তর একমাত্র পরিচালক নিজেই দিতে পারেন। কিন্তু টিকাটিপ্পনী একেবারেই নেই তা-ও তো নয়। গল্পের শেষে, যে মন্দিরে বিজন বোসের কাজ রাখা হলো, সেখানে বাইরে স্পষ্ট লেখা ছিলো জুতো খুলে প্রবেশ করার কথা। তিথি সে নির্দেশ অমান্য করে। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে সিগারেটটা ফেলে মিউরালের সামনে গিয়ে বসে। তারপরে এক অ-স্ট্রাক মুহূর্তে, প্রায় অবচেতনের তাড়নায় পা থেকে চটিজোড়া খুলে সরিয়ে রাখে। নিশ্চিতভাবেই এটা এক লক্ষ টাকার চেক হাতে পাবার ফল নয়। বিজন বোসের কাজের, এবং মতাদর্শের সামনে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি। এই কি সেই শাশ্বত মুহূর্ত?

এ ছবির সবচেয়ে দুর্বল এবং অপ্রয়োজনীয় অংশ নিয়তির সঙ্গে সংলাপ। পুরাণগাথায় নিয়তি দেবী। ফ্যাঁসফেসে কণ্ঠস্বরের অধিকারী পশমী চাদর জড়ানো পুরুষ কোনভাবেই নয়। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, ছবিকে পরিণতিতে টেনে নিয়ে যাবার জন্য এই অদ্ভুতুড়ে ব্যাপারটির আমদানি করার কোন দরকার ছিলনা। ধৃতিমান অসম্ভব শক্তিশালী অভিনেতা। একটা শেক্সপীয়ার সুলভ মোনোলোগ অনায়াসে উতরে দিতে পারতেন। নিজের কাজের সামনে দাঁড়িয়ে বিজন বোস বলতেই পারতেন শাশ্বত শিল্পের কথা। কোন ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য সিদ্ধ করলো কিনা এই নিয়তি, তাও বোঝা গেল না। বরং এইটুকু সচেতন দর্শকের কাছে খুলাসা হয়ে গেল, যে ছবির গল্পের পরিণতি নিয়ে পরিচালক নিজেই একটু দ্বিধায় ছিলেন।

যে কথা প্রথমে বলছিলাম, শিল্প মানে শুধু ফ্রেমে বাঁধানো বস্তুটুকু নয়, বা ত্রিমাত্রিক স্পেসে আবদ্ধ ভাস্কর্য বা এমনকি ইনস্টলেশনও নয়, বরং শিল্প মানে এক যাপন। সম্পূর্ণ জীবনচর্যা যদি শিল্প না হয়ে উঠতে পারে, সূর্যোদয়ের মুহূর্তটি যদি সম্পূর্ণ শরীর এবং অস্তিত্ব দিয়ে অনুভব না করা যায়, তাহলে শিল্প অর্থহীন। শান্তিনিকেতন এই শিক্ষাই দিয়ে এসেছে এতকাল। আজ যদি সেই শিক্ষায় শিক্ষিত কারো সামনে হঠাৎ বলা হয় আর্ট ইস ডেড – তার ক্ষেপে ওঠারই কথা। ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বক্তাকে বের করে দেবারই কথা। এত কিছুর পরেও – আমার তরফে শুধু একটি ‘উট কি কাঁটা বেছে খায়’ মুহূর্ত – তিথি কেন? তীর্থঙ্কর বা তথাগত নয় কেন? মানে মহিলা শিল্পীই কেন? মহিলা শিল্পীদের লড়াইয়ের আরেকটি ভিন্নতর মাত্রা আছে, সেটা নিয়ে কিন্তু এ ছবি নীরব! নেহাতই আই ক্যান্ডি? নাকি তিথির আচরণ গ্রাম্য জীবনের সঙ্গে কতোটা বেমানান, তার সিগারেট টানা, কথায় কথায় খিস্তিখামারি করা ইত্যাদি – সেই শক্‌ এলিমেন্টটাকে দেখানো? অন্যকিছু ভাবা যেত? জানিনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *