মোহনদশা

গান্ধীও তাঁহার জীবদ্দশায় লিঞ্চ’ শব্দ ব্যবহার করিয়াছিলেন। সেও করিয়াছিলেন আধুনিক কেতায় মিডিয়ার বিরুদ্ধে যারপরনাই অসন্তোষ ব্যক্ত করিয়া। অবশ্য প্রসঙ্গ ভিন্ন ছিল, ছিল আমেরিকার রঙীন জনতা (তখন নিগ্রো বলা হইত, এবং লোকেও নিগ্রোই বুঝিত) কিরূপে শ্বেতাঙ্গগণের দ্বারা অত্যাচারিত হইতেছে সেই প্রসঙ্গে। কিন্তু তাহাতে কী হইল? এমন কি কোন প্রমাণ আছে যে রাজা জন্মেজয়, অথবা মুনি বশিষ্ঠ লিঞ্চ’ শব্দের প্রয়োগ করিয়াছিলেন? নিদেন শিবাজী মহারাজ? নাই – সুতরাং লিঞ্চ শব্দের ভারতীয়ত্বও অপ্রমাণিত রহিয়া গেল। গান্ধী মহাশয় তো প্রিটোরিয়া হইতে আগত এবং ইংরাজী শিক্ষিত ব্যারিস্টর। তাঁহার কাছে ভারতীয়ত্ব শিক্ষা করিতে অনাগ্রহী নাগপুরিয়া উল্লুককুল, মোহন ভাগবত যেখানে উল্লুককুলশিরোমণি হইয়া থাকেন। নাগপুরিয়া হইলেও উলূপী-গর্ভজাত নাগবংশের সহিত উহাদের প্রবল বৈরিতা।

সে যাহা হউক, ইংরাজী লিঞ্চ শব্দের কোন ব্যবহারযোগ্য অনুবাদ, এমনকি হনুবাদও হয় নাই। একদল লোক হঠাৎ ঘিরিয়া ধরিয়া একজন অসহায় ভিন্নধর্মের নিরীহ মানুষকে মুষ্টিযোগ দিয়া বিষ্ণুলোকে প্রেরণ করিতে পারে, সভ্যসমাজে আমেরিকানরা ব্যতীত এমন কথা কেহ কল্পনাও করে নাই, সুতরাং যথোপযুক্ত শব্দও নাই। এমদাবস্থায় আখলাক-রাকবর-তাবরেজ প্রমুখের বীরগতিপ্রাপ্তি হইল কি উপায়ে?

বর্তমান লেখকের একটি প্রস্তাব আছে। বস্তুতঃ ষোড়শসহস্র গোপিনী ঘিরিয়া কৃষ্ণকে অল্প একটু করিয়া আদর করিলেও যাহা হইত, তাহা নেহাত বিষ্ণুর অবতার না হইলে সহন করা অসম্ভব, আমরা সকলেই এই বাস্তব কিছুটা জানি। উপরে উল্লিখিত হইল যে নামগুলি, অথবা এমনকি দাভোলে-পানসারে-কালবুর্গি-লঙ্কেশ প্রমুখগণও কোনদিন বিষ্ণুর অংশ ছিলেন বলিয়া অতিবড় অধার্মিকও দাবী করিবেন না। কিন্তু তাবরেজ আনসারির কি হইল, অথবা এই সেদিন জিয়াগঞ্জের পরিবারটির? প্রতিবেশী দেশের ফাহাদ আবরার-এর? ভারতীয় শব্দের যখন নিতান্তই অভাব, গণরোষ, কৌমআস্ফালন প্রভৃতি যখন মূল বিষয়টি বিধৃত করিতে ব্যর্থ – তখন ইহার নাম হউক মোহনদশা আখলাক মোহনদশা প্রাপ্ত, তাবরেজও তাই। এমনকি কালবুর্গিরাও তাই, যদিও হত্যাকারী সেখানে ভীড় জমায় নাই, কারণ তাহাদের হাতে ছিল অব্যর্থ আগ্নেয়াস্ত্র, কিন্তু ব্যষ্টিগত মানসিকতা সেই একই। উল্লুককুলশিরোমণির প্ররোচনাই এই প্রত্যেকটি হত্যাকান্ডের মূলে পরিলক্ষিত হইতেছে। অতএব উহারাও মোহনদশা প্রাপ্ত। আশা করিতে দোষ নাই যে এই শব্দের মধ্যে অভারতীয়সুলভ কিছু খুঁজিয়া পাইবেন না “সরসঙ্ঘচালক” উল্লুক মহাশয় এবং তাঁহার অনুচর ক্রুদ্ধকপি সেনানী।

মোহনদশা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.