ওই চোর, ওই চোর …

ছিপ নিয়ে গেল কোলা ব্যাঙে, মাছ নিয়ে গেল চিলে! সারদা-রোজভ্যালীর এত টাকা গেল কোথায়? এ প্রশ্নগুলো তখন মনে আসেনি, যখন ২১ দিন ধরে রাস্তা কেটে সিঙ্গুর বিপ্লব চলছিল, টাকা কে জোগাচ্ছিল? যখন ঢপের মাওবাদীদের হাতে, যারা এখন ‘আদিবাসী সমন্বয়’ করে এবং বিজেপির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধে, রাশি রাশি অস্ত্র আসছিল – কে টাকা জোগাচ্ছিল? বিমল গুরুং-দের হাতে এত অত্যাধুনিক অস্ত্র কোত্থেকে আসছিল, কার টাকায়? সারা রাজ্য জুড়ে তিনু লুম্পেনদের বাইক আর রিভলভার কিসের টাকায় কেনা হচ্ছিল? লালগড়ে যারা দিনে চটি পুলিশ এবং রাতে মাওবাদী সাজছিল, যাদের অনেকেই পরে সত্যি-সত্যি চটি-পুলিশ অর্থাৎ সিভিক পুলিশ হয়ে গেল, তাদের খরচ কে জোগাচ্ছিল? এ সব প্রশ্ন তখন মাথায় আসেনি, যে সরকারি কোষাগারে “৩৪ বছর অপশাসনের” পরেও এত টাকা কোত্থেকে এল যে ক্লাবে ক্লাবে ২ লক্ষ টাকা করে দেয়া শুরু হল? রাজ্য তো নাকি চলে ঋণের টাকায়, সরকারী কর্মীদের মাইনেও বন্ধ হয়না, ২-৪ মাস দেরী হলেও হতে পারে। তবু এই টাকার স্রোত কোথা থেকে আসে? এত উন্নয়নের উৎস কী? মোদ্দা কথা হল, ওই হাজার পাঁচেক কোটি আর নেই। হজম হয়ে গেছে। তার কিছুটা, খুবই ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ, আপনার নিজের পেটেও গেছে। রাজ্য জুড়ে নীল-সাদা রঙ দেখে মোহিত হয়েছেন, উদ্বুদ্ধ হয়েছেন, অনুপ্রাণিত হয়েছেন। লাল-পার্টি ভোগে গেছে সে আহ্লাদে নিজেই নিজেকে মাংসভাত খাইয়েছেন, ওই টাকার অংশ সে ঝোলে মেখে আপনি নিজেই খেয়ে ফেলেছেন। এখন চোর ধরে তাকে কুঁচিয়ে কাটলেও টাকা ফেরত আসবেনা। এবং বিশ্বাস করুন, সমস্ত দক্ষিণপন্থী শক্তি, তৃণমূল সমে্‌ত, মিলিত ভাবে এই উপমহাদেশে যে পরিমাণ টাকার লেনদেন করে, সে তুলনায় ওই পাঁচ হাজার কোটি নিতান্তই নস্যি! আপনার ছাপোষা নিম্ন-মধ্যবিত্ত কানে ওটা বিরাট অঙ্ক শোনালেও কিছু করার নেই স্যার, দুঃখিত।
—-
মদন চোর? মুকুল চোর? আমি চোর? অর্ধদশক পরে – রাজীব চোর? আমি চোর? আজ্ঞে হ্যাঁ মাননীয়া – আপনিই। আপনিই চোরেদের রানী। ইংরেজীতে বলে buck stops at you – এটা আপনার একনিষ্ঠ কর্মীরাও জানে। উপরমহলে কিছু চোর এবং হার্ডকোর দুষ্কৃতী, দ্বিতীয় স্তরে কিছু লোভী এবং লাথখোর রামছাগল, এবং তার নিচে পালে পালে মূর্খ লুম্পেনের দল যার বড় অংশ সিপিএমের গোয়ালে লালিত-পালিত হয়েছিল – এই নিয়ে আপনার দল। কে চোর – সে কথা আদালত বলতে পারে। জনগণ নয়। নানাবিধ ডুগ্‌গিবাজি করে ভোট নামক খেউড় উতরানো গেলেও সত্যটা তাতে পাল্টে যায়না। কিন্তু এইখানেই একটা বড় সমস্যা আছে। মস্ত বড়। 
—-
যাদের হাতে ক্ষমতা আছে আদালত এবং তদন্তকে নিয়ন্ত্রণ করার, যাদের মুখের দিকে চেয়ে ১৭ লাখ আমানতকারী এবং তাদের নিয়ে রাজনীতি করতে চাওয়া ভন্ডদের দল বসে আছে – তারাও এই সংগঠিত অপরাধের অংশীদার – partners in crime … । আজ্ঞে না, শুধুই নৈতিক অংশীদারিত্ব নয়। অস্ত্র এবং টাকা জোগানোর চ্যানেলে প্রত্যক্ষভাবে, হাতে কলমে কাজ করেছে আর এস এস নামক আর একটি বে-আইনী সংস্থা – যারা নাকি বিগত চল্লিশ বছর ধরেই ভারতীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে, এবং বি এস এফ সমেত সমস্ত আর্মড ফোর্সের মধ্যে ওদের নিজেদের লোক আছে। এই অঞ্চলে অস্ত্র জোগানের চ্যানেলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার জন্য দরকার হয়েছিল এমন কাউকে যে নাকি দীর্ঘদিন ধরেই চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ-ভারত রুটটা জানে এবং ব্যবহার করে। সেরকম একজন “অতিবাম” নেতাকেও পাওয়া গেল যাকে মাওবাদী বলে লোকে অর্থাৎ মিডিয়া এবং পুলিশ চেনে – কিন্তু এটা জানেনা যে তার পার্টিই তাকে ক্লোজ করে দিয়েছে ২০০৬ সালে। ক্লোজ করার অর্থ সে আর নীতিগত কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশ নয়, কোন কমিটিতে নেই। তা নেই তো বয়ে গেল! বিহার-ঝাড়খন্ড-বাংলায় ক’জন সেকথা জানে? মাওবাদী নামেই একাধিক এক্সটর্শনিস্ট গ্রুপ তৈরী হল আদিবাসী ছেলেদের টাকার টোপ দিয়ে। খনি অঞ্চলে এবং ইস্পাত কারখানা অঞ্চলে তারা টাকা তুলতে শুরু করলো, একই সঙ্গে শুরু হল সারদা-র মত বেশ কয়েকটি ছোটবড় কম্পানির নামে ব্যবসা। মানে ব্যাপারটা দাঁড়ালো, সব পাখিই মাছ খায়, নাম হয় সুদীপ্ত সেন-গৌতম কুন্ডুর। সেই টাকার অনেকটা ব্যবহার হল অস্ত্রের জোগান দিতে, মদের জোগান দিতে – মানে গোদা বাংলায় সংগঠন বানাতে। সঙ্গে জুটল কিছু বেশ্যার অধম সাংবাদিক, আনন্দবাজার এবং বর্তমানের ব্যানারে, যারা ধাপে ধাপে সুর চড়িয়ে জনমত তৈরী করলো। এবং এই পুরোটা হল আর এস এস-এর তত্ত্বাবধানে, জে এম বি-র সহযোগিতায়, অর্ধেক দেশী, এবং অর্ধেক বিদেশী টাকায়। আজ্ঞে হ্যাঁ – ঠিক পড়েছেন। বিদেশী টাকাও ছিল। একদা কমরেড আজিজুল হকের কাছে শুনে নেবেন সে বৃত্তান্ত। তারপর সময় মতো সেই অতিবাম নেতাটিকে সরিয়ে দেয়া হল – এবং বাকি মাওবাদীরা সুড়সুড় করে চটি-পুলিশ হয়ে গেল।
—- 
সুতরাং যদি কোন অবোধ বালক, অথবা খোকা বাম ভেবে থাকেন যে বিজেপির নেতৃত্বে সি বি আই তদন্ত করে সব উদ্ধার করে দেবে, আর ১৭ লাখ আমানতকারী তাদের পয়সা ফেরত পেয়ে যাবে – তাহলে তাকে আমার তরফ থেকে একটি ললিপপ দেয়া রইল। এই তদন্ত সঠিক পথে করলে নারী/শিশু পাচার, অবৈধ ডলার লেনদেন, অবৈধ বালি খাদানের মত বড় বড় কেউটে সাপ বেরিয়ে আসবে যার সঙ্গে কংগ্রেস এবং বিজেপি উভয়পক্ষেরই তাবড় তাবড় নেতা জড়িত। সুতরাং মাননীয়া নিশ্চিন্ত। কেউ ব্যাপারটাকে সেই পর্য্যন্ত ঘাঁটিয়ে তুলবেনা। ছোটখাট কোল্যাটারাল ড্যামেজ হতেই পারে। এদিকে একটা এম পি, ওদিকে দুটো এম এল এ – খামখাই হয়তো জেলে চলে যাবে। রাজীবকুমার বা সুরজিত করপুরকায়স্থ-ও জেলে যেতেই পারে। তাতেও কিছুই হবে না। টাকাও উদ্ধার হবেনা। নীল-সাদা হাওয়াই চটিও টস্‌কাবেনা। 
—-
সবশেষে সেই ১৭ লাখের কথা। যারা টাকা দিয়েছিলেন। সরকারের কাছে ফেরতের দাবি করবেন না। সরকারের অধিকারই নেই টাকা ফেরত দেবার। মশাই অবাস্তব লাভের লোভ ছিল আপনার। জেনেশুনে জুয়া খেলেছিলেন। সে বেশ করেছিলেন, আপনার টাকায় আপনি জুয়া খেলবেন, না সোনাগাছি যাবেন তাতে আমার বাবার কি? কিন্তু আমার প্রদেয় ট্যাক্সের টাকায় সেই লোভের মূল্য চোকানোর চেষ্টা হলে, আমার এবং আমাদের, আপত্তি আছে। আপনাদের টাকা গেছে। লাল ডায়েরি, নীল পেনড্রাইভ (ও, নীল ছিলনা বুঝি?) সবই কাক-চিলে নিয়ে গেছে। ধর্না না দিয়ে কাজের কাজ করুন। এই দুনিয়ায় টাকা বানানোটা সবচেয়ে সোজা কাজ, টাকা “উদ্ধার” করাটা সবচেয়ে কঠিন। বিশ্বাস না হলে আপনার নিকটবর্তী ব্যাঙ্ক ম্যানেজারকে প্রশ্নটা করে দেখুন। আর খোকা বামেরা, যারা আট লাখের ব্রিগেড করে এবার ওই সতেরো লাখের পিছনে পড়েছে – মনে রাখবেন – পঁচিশ লাখেও কিন্তু ভোট জেতা যাবে না। আর ভোটে জিতলেও পৃথিবী জোড়া বামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাস আপনাদের বিশ্বাসঘাতক সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট বলেই মনে রাখবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.