স্মৃতি

একজন রাজনৈতিক কর্মীর আত্মকথন কিরকম হয়? স্মৃতিচারণ? একজন সশস্ত্র বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা কর্মী ঠিক কিভাবে মনে করেন অতীতের কথা? একজন সশস্ত্র সংগ্রামী, যিনি একদেশ থেকে আরেকদেশে গিয়ে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রভাবে সেখানকার স্থানীয় আন্দোলনে নেতৃস্থানীয়দের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, তাঁর স্মৃতিচারণ কিরকম হতে পারে? বিশেষতঃ, যখন রাজনীতির পাশাপাশি ব্যক্তিচেতনার পরিসরে একটা স্পষ্ট বিবর্তনের ছাপ পড়ে, তখন? চলুন পড়ে দেখি কিছু পংক্তি। এ লেখা সম্পূর্ণ হয়নি। উপন্যাস হয়নি। হবে কিনা কোন দিন তাও জানা নেই। লেখিকাকে অনুরোধ করবো – তারপর? কিন্তু যতটা আছে, সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ দলিল। চৈত্যপত্রিকা এই দলিলকে অবজ্ঞা করতে পারেনা।

স্মৃতি


মঞ্জী খালেদা বেগম

১৯৭০ সাল। আন্দোলনের ঢেউ উঠছে চারিদিকে। সব উল্টেপাল্টে তছনছ করে দেওয়ার সময়। ছাত্রদের মধ্যে অসার পড়াশোনা ছাড়ার উত্তেজনা। বিপ্লবের ডাকে চিরকাল তরুণরা অকুতোভয় হয়ে যায় ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। সবাই ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় সংগ্রামে। কেউ সচেতনভাবে বুঝে, আর কেউ অ্যাডভেঞ্চারাস হয়ে। তবু তো অগ্রগামী।
সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক। তরুণদল সবার আগে। চোখেমুখে প্রাণ ঢেলে দেওয়ার আকুতি। সে ঢেউ এসে পৌঁছে গেল দুয়ারে আমার।
হায়ারসেকেন্ডারির সীমা টপকে কলেজ। ভর্তি হলাম। দাদা বল “নামকা ওয়াস্তে”। সে তখন আমার আদর্শ। রাজনীতিতে তার কাছেই নাম লেখানো। আরেকজন ছিলেন। বাবুলদা।
তবে আমার পক্ষে রাজনীতিতে আগ্রহী হওয়ার একটা অন্য প্রেক্ষাপট ছিল। অনেকটা আশ্রয় নেওয়ার মতো।
আমাদের বাড়িতে অনাত্মীয় ছেলেদের অবাধ গতি ছিল। কেউ দারিদ্রপীড়িত ছাত্র, কেউবা দিদির মেধাবী ছাত্র। সবাই বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার পেত। কিন্তু সেকালে একটা জিনিসের খুব অভাব ছিল। বাড়ির কিশোরী মেয়েটির বড় হয়ে ওঠা, তার সমস্যাগুলি শোনার বা বোঝার মত কোনো মানুষ ছিলনা। বড় হয়ে ওঠাটা দেখা যেত, কিন্তু তার সমস্যাগুলিকে পাকামো বলে তিরস্কারের ভয় থাকত। ফলে পরিবারের কারো কাছ থেকে মানসিক সহায়তা পাওয়ার আশা ছিলনা। বাইরের কারো মনের কথা বলার মতো কেউ ছিলনা। ফলে যথেচ্ছ গোপন অত্যাচার নিজকেই সামাল দিতে হতো। এমনকি নিজেকে বাঁচানোর জন্য বিছানার নীচে ড্যাগার, গুপ্তি রাখতাম। শেষমেষ এগুলি আমাকে ভালোভাবেই রক্ষা করেছে। অন্তিম ঘটনাটি ছিল এক অত্যন্ত মেধাবী দিদির ছাত্র আমাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করেছিল। আর থাকতে না পেরে ভয়ানকভাবে প্রতিবাদ করেছি।


কিন্তু আমার মুখর প্রতিবাদ চাপা দিয়ে দেওয়া হ’ল সেই দরিদ্র মেধাবী ছাত্রের ক্যারিয়ার গঠনের তাগিদে। বলা হল চুপ থাকতে। সেই সঙ্গে জানানো হ’ল তার সাথে আমার বিয়ে দেয়া হবে। এইবার আমি গর্জে উঠলাম “কখ্খনো নয়।“I hate him!” আমার মন রাগে অভিমানে দুমড়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আমি এক ঊষর মরুভূমিতে আছি তপ্ত বালির সাগরে একা,কোনো ছত্রছায়াহীন। শুধু মায়ের ব্যথাভরা দুচোখ ছিল আমার আরাম।
আমার নিজের ওপর ঘেন্না এসে গেল। তখনকার সেই লাঞ্ছনা আজকের দিনে যা শুনি তার তুলনায় তুচ্ছ ছিল। তবু আমি পথ খুঁজতে লাগলাম বিভিন্ন গল্প উপন্যাসে। খুঁজতে লাগলাম আমার মতো একটি চরিত্র যাকে দেখে আমি শিখবো।কিন্তু পাইনি। এই অবস্থা চলেছিল ক্লাশ সেভেন থেকে টেন অব্দি। নিজের লড়াই চালাতে চালাতে নিজেকে বিচার করতে করতে হয়ে উঠলাম শক্ত ও সাহসী।মনে মনে ভাবলাম “শরীর আর মন দুটো আলাদা জিনিস। আমার মন, সে তো কলুষিত হয়নি। পাঁচ বছর বয়সে যেমন পবিত্র ছিল তেমনি আছে।”
হায়ারসেকেণ্ডারি পেরোলাম। কলেজে মাসখানেক ক্লাশ করেছিলাম। পারিপার্শ্বিক আবহাওয়া দেখে মায়ের জেদে আমাকে ঢাকায় রেখে আসা হল।ভালো ছবি আঁকতাম। মেজদা বলল আর্ট কলেজে ভর্তি করে দেবে। মেজদা আবার একটু বিপ্লবী আগুনে হাত সেঁকতে ভালোবাসতেন। তিনি একদিন তার বাড়িতে নিয়ে এলেন একজনকে। পরিচয় করিয়ে দিলেন।
“এই হচ্ছে আমার বোন। ওর সঙ্গে কথা বলতে তোমার ভালো লাগবে।”
দেখলাম ছোটখাটো চেহারার সুদর্শন ভদ্রলোক। চোখে কালো ফ্রেমের একটু পুরু লেন্সের চশমা। ঠোঁটের উপর সরু গোঁফ। সভচেয়ে লক্ষণীয় বড় বড় টানা চোখ।
” এই হচ্ছে আজমী, তোকে এঁর কথা বলেছিলাম”
এর পর থেকে উনি প্রায়ই আসছেন। আমাকে রাজনৈতিক লাইন বোঝাচ্ছেন। পূর্ববাংলা কিভাবে পাকিস্তানের উপনিবেশ। সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে মুক্ত করতে হবে। বৌদিরা যেমন হয় তেমনি, কৌতুহল নিয়ে চা জলখাবার দেওয়ার ছলে একটু কথা শুনে যাচ্ছে।এমনি একদিন আমি একটা বোকার মতো কাজ করে বসলাম। জিজ্ঞেস করলাম “আপনি কোথায় থাকেন?” ভদ্রলোক কিছু বলার আগেই দ্বিতীয় প্রশ্ন “আপনার বাড়িতে কে কে আছেন?” আজমী আমার মুখের দিকে চুপচাপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। তারপর শান্তভাবে বললেন “আমি আপনার সাথে এসব আলাপ করতে আসিনি। ব্যক্তিগত বিষয় জানার কোনো দরকার আছে কি?” তারপর আর কখনো সে ভুল করিনি যতদিন না বাড়ি ছেড়েছি।


উদ্বুদ্ধ হচ্ছি। আজমী প্রায়ই আসছেন। সংগঠনের লাইন বোঝাচ্ছেন। পূর্ববাংলা পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশ কারণ পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী পুববাংলা থেকে কাঁচামাল সস্তায় কিনে নিয়ে গিয়ে ওদের কলকারখানায় পণ্য উৎপাদন করছে, তা চড়াদামে বেচবার বাজার আবার এই পূর্ববাংলাই। সংস্কৃতির উপরেও গুণ্ডাগিরি। বাংলাভাষা চর্চার উপরেও নিয়ণ্ত্রণ। রবীন্দ্রনাথ চর্চা নিয়ণ্ত্রিত। মানুষের দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পূর্ববাংলাকে মুক্ত করতে হবে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে শ্রমিক, কৃষকের নেতৃত্বে। মতাদর্শ মার্ক্সবাদ, লেনিনবাদ এবং মাও সে তুং এর চিন্তাধারা। কমিউনিস্টের আন্তর্জাতিকতাবাদের শিক্ষায় আগেই শিক্ষিত ছিলাম। সংগ্রামে যেকোনো জায়গায় অংশগ্রহণ করা যায়। ভারতীয় বংশোদ্ভূত হওয়া সত্বেও ঐ বাংলার সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হলাম। এ যেন আমার পরিত্রাণমন্ত্র হ’ল।
এদিকে মেজদা দেখলেন ভারী মুশকিল! কারণ খাল কেটে কুমীরটাকে তিনিই ঘরের দুয়ারে এনেছেন। তাই দায় এড়াবার জন্য তিনি এবার আমার বিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় ব্যাপৃত হলেন। কোনো একজন বাস্তুকলাবিদ আমাকে নাকি নিউমার্কেটে দেখে পছন্দ করেছেন। মেজদা নিজেও ঐ পেশায় ছিলেন। এদিকে আমি সংগঠনে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে মনস্থির করে ফেলেছি। ওদিকে আমার বিয়ের উপলক্ষে অন্যান্য দাদা, দিদিরা একত্র হয়েছেন। অনেক তর্কবিতর্ক চলল। যেদিন পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে সেদিন আমার শেষ কথা বললাম। দাদাকে বললাম “ঠিক আছে ,আমি রাজী। তবে এক শর্তে।” “কী শর্ত?” “আমি ছেলের সঙ্গে কথা বলবো। আমার জীবনের সবকিছু বলবো। তা শুনে সে যদি বিয়ে করতে রাজী থাকে তো।”
ব্যস! জোঁকের মুখে নুন। কিন্তু আমি যতটুকু জানতাম পাত্র এসব শুনেও রাজী হয়ে যেতো। কিন্তু ভাগ্য ভালো যে দাদা মানসম্মানের ভয়ে আর এগোলেন না। নিজেদের মধ্যে চেঁচামিচি করে যে যার পথ ধরলেন। আজকালকার দিন হলে এসব কিছুই হতনা কারণ হাজার লাঞ্ছনাতেও আমার কৌমার্য অক্ষুণ্ণই ছিল। আমি লড়াই করে নিজেকে বাঁচাতে সক্ষম হয়েছিলাম।
এরপর একদিন আজমী বাড়ির পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আমাকে ঢাকার সলিমুল্লা হলের একটি ঘরের চাবি দিয়ে বললেন, “কখনো পরিস্থিতি খারাপ বুঝলে ঐ হলে চলে যাবেন। ওখানে অপেক্ষা করবেন।”
একদিন ভাবলাম, “যাই। কি প্রতিক্রিয়া হয় দেখি।” তৈরী হয়ে নিলাম। তখন ঢাকার রাস্তাঘাট কিচ্ছু চিনিনা। তবে জানতাম স্মার্টনেস দারুণ সহায়ক যে কোনো পরিস্থিতিতে। রিক্সা নিলাম। বললাম, “সলিমুল্লা হল চল।” রিক্সাওলা মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো হতভম্ব ভাব, কারণ সেসময়ে একলা একটি মেয়ে তাও আবার তরুণী ছেলেদের হস্টেলে যাবে সেটা তার কাছে হতভম্ব হবারই ব্যাপার। বললাম, “কি হল? চল।” এবার সে একটু তাকিয়ে নিয়ে কি বুঝলো কে জানে চলতে শুরু করলো এবং অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছে দিল। ভাড়া মিটিয়ে ঢুকলাম হলে। সিঁড়ি খুঁজে নিয়ে দোতলায় উঠলাম। চারদিকে চক মেলান দালান। সারিসারি ঘরের সামনে দিয়ে টানা বারান্দা। ঘরটা ছিল প্রায় আট-ন’টা ঘরের পর। আমি বারান্দা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। পায়ে হিলের বিচ্ছিরি টক টক আওয়াজটা ঠেকানো যাচ্ছেনা। সেই অপরিচিত আওয়াজে পাশের ঘরগুলোর দরজায় কয়েকটা মুখ বা আদ্ধেক শরীর বেরিয়ে এলো। কারো পরনে গামছা কারো বা আধেক গালে দাড়ি কামানো সাবানের ফেনা। মুখগুলো আমাকে দেখেই সাময়িক ভাবে লুকোলো। কিন্তু নির্দিষ্ট ঘরের সামনে গিয়ে যখন তালা খুলছি, তখন ঠিক কাছের ঘরের মুখে দেখলাম গোল গোল ছানাবড়া চোখ! মনে মনে হেসে ঘরে ঢুকে পড়লাম। দরজা বন্ধ করে বসলাম। দেখলাম দুটি বিছানা। একটি টেবিলের উপর কবি সুকান্তর সেই বিখ্যাত চিরতরুণ রেখে যাওয়া গালে হাত ছবি। টেবিল থেকে একটি বই সম্ভবত লেনিনের কোনো একটি হবে নিয়ে বসে পড়লাম। ঐ অবস্থায় কি মন বসে? প্রায় আধঘণ্টা কোনো এক অদৃশ্য অপরিচিত সঙ্গীর জন্য অপেক্ষা করে বইটি কাঁধের ব্যাগে চালান করে বের হলাম। দরজায় তালা দিতে গিয়ে আবার সেই চোখগুলো। সেদিনের মতো বাড়ির পথ।


আমার জন্ম হয়ে ছিল চব্বিশ পরগনার শামনগরে। গারুলিয়া জুটমিলের ডাক্তার ছিলেন বাবা। সেখানে থাকতেই কুচবিহারের বাড়িটা তৈরী করেন। আমরা কুচবিহারের বাড়িতে আসি বাবা রিটায়ার করার পর। তার আগে আমার কাকা আর আমার সমস্ত পরিবারের দাদা দিদিরা এই বাড়িতে থেকে শহরের স্কুলে কলেজে পড়তেন। কারণ আমাদের ক্ষেতজমি ছিল গ্রামে। কাকারা ওখানেই থাকতেন। তাঁরা পরে পূর্বপাকিস্তানে চলে যান। দাদা দিদিরাও একে একে চলে যান। বাবা ঘোর পাকিস্তানবিরোধী ছিলেন। পাকিস্তানের নাম শুনলে চটে যেতেন। কিন্তু মায়ের নাড়ীছেঁড়া ধন তো এপারে ওপারে ভাগ হয়ে গেছে। মায়ের বুকটাই যেন চিরে দুফালা হয়ে গেছিল, আজ মা হয়ে সেই ব্যথাটা বুঝি। বাবার সাথে লড়াই করে একেকবার পাকিস্তানে গিয়ে সন্তানদের দেখে আসতেন। যাক সে কথা।
সলিমুল্লা হল থেকে ফিরে বৌদির প্রশ্নের মুখে পড়লাম। এমনিতে মেজবৌদি আমাকে খুব ভালোবাসতেন, এবং দাদাও। তবে আমাকে পাহারা দেওয়ার ব্যাপারটা বেচারা বৌদির উপর ন্যস্ত।
“কোথায় গিয়েছিলি?”
“ঐ একটা কাজে।”
“কাজে? তুমি ঢাকার রাস্তাঘাট চেনোনা কিছুনা, গেলে কার সাথে?”
“একা।”
“তুমি বললেই বিশ্বাস করতে হবে? ঐ আজমী নিশ্চয়ই? জানো, ও একটা বিহারী (অবাঙালী) ছেলে,ওকে এত বিশ্বাস করছো, তাছাড়া ওকে তো তুমি ভালো করে চেনই না। কিছু হলে তোমার ভাইকে কি জবাব দেবো?”
এর মধ্যেই দাদার আবির্ভাব। চলল বকাবকি। বাইরে বেরোনো বারণ হ’ল। আজমীর সঙ্গেও ওদের ঝামেলা হ’ল একদিন। আমি সেদিনই ওনাকে জানিয়ে দিলাম আমার সিদ্ধান্ত। রাত্রে শুয়ে ভাবতে লাগলাম, সত্যিই তো ওনাকে বা ওদেরকে তো চিনিনা। মুখের কথায় বিশ্বাস করছি। যদি নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয়। মানুষকে দেখে চেনার অভিজ্ঞতা তো আজ হয়েছে। তাই ভাবি কী অর্বাচীন ছিলাম তখন। এমন কথা ভাবতে পেরেছিলাম? তবে এটাও আমার একটা শক্তিশালী দিক। আমি চিরকাল কোনকিছুর অষ্টআশিভাগ যদি ভাল ফল সম্পর্কে নিশ্চিত হই তো বারো ভাগ মন্দ ফলের দিকটাও ভেবে রাখি।ভাবলাম, কি করা, যাবো যা হয় হবে। কতো মেয়েই তো রোজ বিক্রি হয়ে যায়, হব তাদের একজন। পরদিন সন্ধ্যায় দাদা গেছেন নিউমার্কেটে বিরিয়ানি আনতে। সেই সুযোগে আজমী হাজির। আমি তো তৈরীই ছিলাম। বেরিয়ে এলাম বাড়ি ছেড়ে। নীচে নেমে দেখলাম আরো একজন দাঁড়িয়ে। গলি থেকে বেরিয়ে রাজপথ। নিমেষে সব অতীত পেছনে ফেলে জনারণ্যে মিশে গেলাম।
আমি আজমীর সাথে রিকশয়। সুলতান সাইকেলে। আমি চুপচাপ। সন্ধ্যার অন্ধকারে শুধু পথের পাশের আলো আর দোকানের আলো এসে পড়ছে। গলিটার নাম ছিল ভূতের গলি আর যে রাস্তাটা দিয়ে যাচ্ছি সেটা হাতির পুল নাম। তখন সেটা প্রায়ান্ধকার ছিল। এখনকার ঐ এলাকা দেখে কারো সাধ্য নেই স্মৃতিতে আগের ছবি আনে। আমাকে চুপ থাকতে দেখে আজমী জিজ্ঞেস করলেন, “মন খারাপ লাগছে? এখনো সময় আছে ফিরিয়ে দিয়ে আসতে পারি।”
বললাম, “অনেক ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বাঁচবো একবারই। জীবনটাকে কাজে লাগাতে পারলেই বাঁচা হবে। আমার সত্যিই কোনো পিছুটান নেই।”
এইবার আজমী আমার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। ঐ স্বল্প আলোয় যেন দেখতে পেলাম ওর চশমার আড়ালে বড় বড় চোখদুটিতে যেন মুঠো মুঠো জোনাকী।চোখ সরিয়ে নিলাম, কিন্তু আমার ভেতরে সে আলোর ছটা যেন ছড়িয়ে গেল। সব দ্বিধা সরে গেল এক নিমেষে। দৃঢ়তা সে জায়গাটাও পূর্ণ করল।
আমাকে নিয়ে প্রথমে ওরা গেল আকাভাই-এর ইন্জিনিয়ারিং হস্টেলে। দেখলাম বেশ আমুদে লোক। আমাদের নিয়ে যেন একটু হাল্কা হাসি মস্করা করার মুড। কিন্তু আমার গম্ভীর ভাব আর আজমীর নীরব চোখের ধমকে চেপে গেলেন মনে হয়।ওখানে সুলতানকে দেখলাম আলোতে। আকা ভাই প্রথম থেকেই তুমি সম্বোধনে নামলেন। বললেন, “সুলতান যে পাহারা দিয়ে নিয়ে আসলো,ওর হাতিয়ারটা দেখেছ কী?” দেখি সুলতান ওর ঝাঁকড়া চুলো মাথাটা দুলিয়ে হাসছে। কালো গয়ের রঙ আর বড় বড় সাদা ঝকঝকে দাঁত। চোখে পুরু লেন্সের চশমা। শার্টের ভিতর হাত ঢুকিয়ে বের করে আনলো কী না একটা হাতুড়ি।আকা ভাই আগেই চা সামান্য খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। বললেন, “স্বাগতম, নতুন কমরেড”।
ওখান থেকে আমাকে নিয়ে ওরা যেখানে গেল সেখানটা একটা প্রায় বস্তি। পরে শুনেছি ওটার নাম খিলগাঁও। একটা হাফওয়াল টিনের বাড়ি। দরজার কড়া একটু নাড়তেই কেউ খুলে দিলো।একজন মহিলা। “আসো, ভিতরে আসো”। বলে ভিতরের আরেকটা ঘরে নিয়ে গেলেন। ঘরে হ্যারিকেন জ্বলছে টেবিলের ওপর।
আরেকজন বসে আছেন বিছানায়। মনে হচ্ছে তিনি কোথাও যাবার জন্য তৈরী হয়ে আছেন। সাধারণ সাদার উপর নীল রঙের সরু স্ট্রাইপ্ড শার্ট আর ধূসর রঙের প্যান্ট। সহাস্যে তাকালেন আমার দিকে। দেখলাম যথেষ্ট লম্বা এবং দোহারা চেহারা। গায়ের রঙ চাপা ,চোখে চশমা। আমাকে দেখে নিয়ে হেসে বললেন, “এতো একেবারে বাচ্চা মেয়ে, তাহের।”
তাহের আজমীর ছদ্মনাম। “এতো বারো কি তেরো!” আমার ছোটখাটো কচি চেহারা দেখে সবারই এরকম মনে হত। অর্থাৎ আমার এক একটা বয়স কমপক্ষে সাত থেকে আট বছর একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে আজও।
সদর্পে খানিকটা মনক্ষুণ্ণ গলায় বললাম, “মোটেইনা, উনিশ।” হেসে উঠলেন তিনি। কমরেড তাহের এবার পরিচয় করিয়ে দিলেন, “ইনি আমাদের ভাইয়া। আর ইনি আপা” বুঝলাম এর বেশি কোনো পরিচয় পাবোনা আর দরকারও নেই। ভাইয়া বললেন, “এবার ওর একটা নাম দিতে হয়।” আপা বললেন , “সুফিয়া হলে কেমন হয়।” হলেই হয়।
তারপর থেকে বেশ কিছুদিন কাছেপিঠের কমরেডদের কাছে ঐ নামে পরিচিত ছিলাম।


সেই আবাসেই শুরু হ’ল আমার অন্তরাল জীবন।দু’রাত কাটবার পরে এক পরিবর্তন আমার শরীরে টের পেলাম। মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত কৈশোর থেকে ছিলাম। এক বিষণ্ণতা ঘিরে থাকতো সবসময়। ফলে হজম হতনা। রোজ সকালে বমি হত। বাইরে তার প্রকাশ খুব বেশি ছিলোনা। কেউ জানার চেষ্টাও করেনি কোনোদিন। অথচ এই অন্তরালজীবনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই লক্ষ্য করলাম ঐ শারীরিক অসুবিধে উধাও। যেন আমি মুক্ত হাওয়ায় শ্বাস নিতে পারছি।
ওদিকে দাদারা ভয়ানকভাবে তৎপর হয়ে উঠেছে আমার খোঁজে। তারা প্রথমে আজমীর বাড়িতে লোকলস্কর নিয়ে ঝামেলা করতে শুরু করলো।পরে সেটা গেল পুলিশের হাতে।
আমি তো ঘরে বসে কাজ শুরু করেছি। বেরোনো যাবেনা। গোরুখোঁজা চলছে পুলিশে আর আত্মীয়স্বজন মিলে। আমি ঘরে বসে নেতার লেখা আর্টিকেল স্টানসিলে কাটছি। আমাদের কাছে হ্যান্ড রোলার প্রিন্টার ছিল। বিশেষ ধরনের কলম (কালি ছাড়া)দিয়ে বিশেষ ধরণের কাগজে লেখা হ’ত।তারপর সেটাকে কাগজের ওপর বসিয়ে রোলার প্রিন্টার দিয়ে যত খুশি কপি করা হ’ত। ব্যাপারটায় বেশ হাত পাকিয়ে ফেললাম।
যে আপার কথা বললাম তিনি ছিলেন আফ্রোএশিয়ান রাইটার্স ব্যূরো থেকে পুরস্কার প্রাপ্ত লেখিকা।তাঁর নামেও হুলিয়া জারি ছিলো।তিনি একটু বিখ্যাত ছিলেন বলে জায়গা বিশেষে বোরখা পরতেন। এই বোরখা খুব কাজের জিনিস হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
কমরেড তাহেরের ছোটো ভাইও সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।তবে সার্বক্ষণিক কর্মী ছিলেন না। তিনি ঐ বাসায় আসতেন। তিনি খবর দিতেন যে আমার আত্মীয়রা কিভাবে ওদের বাড়িতে গিয়ে উত্যক্ত করছে। তারা কেস ঠুকেছিল আজমীর বিরুদ্ধে যে তাদের নাবালিকা মেয়েকে অপহরণ করা হয়েছে। এসব আজমীর বাবা সইতে পারলেন না। তিনি খোঁজ নিয়ে আসল বয়সটা জেনে নেন। তারপর সংগঠনের কাছে অনুরোধ রাখেন যে নির্দিষ্ট কটা দিন আমাকে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে কয়েকটা এক্সরে করাতে সহায়তা করতে হবে। সংগঠন রাজী হল। মেডিক্যালে চেনাজানা কারো সাথে দেখা হলে ঝামেলা হয়ে যাবে। তাই সেই আবার চলমান তাঁবুতে ঢুকে যেতে হল। ওখানে যাবার পর আজমীর বাবাকে দেখলাম। রোগাপাতলা তীক্ষ্ণ চেহারা। বোরখার নকাব তোলাই ছিল। উনি দেখলেনন। তারপর ছোটোভাই আচ্ছুকে একপাশে ডেকে নিয়ে গেলেন। কি বলেছিলেন সেটা পরে জেনেছি। তিনি ধরেই নিয়েছিলেন আজমী আমার প্রেমে পড়ে আমাকে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন খুব আমুদে। ছেলে মেয়েদের সাথে খুব অন্তরঙ্গ দেখেছি তাঁকে। তিনি আচ্ছুকে একধার টেনে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, “তোর ভাই তো বৌটা বেশ সুন্দর জোগাড় করেছে!” অথচ আমার সঙ্গে আজমীর তখনোও কোনোরকম ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি।
সারা শরীরের এক্সরে হল। রিপোর্টে প্রমাণ হল আমি বালিকা নই, সাবালিকা। কেসে দাদারা হেরে গেলেন। ওঁদের মান গেল। আমার এলো শূল!! কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরোলো! আসলে শাসকগোষ্ঠি বিপ্লব নিয়ে এতই ভীত ছিল যে সর্বত্রই বিপ্লবের ভূত দেখে। ব্যক্তিগত কেস উঠে যাবার পরেই পাকিস্তান সরকার আমার বিরুদ্ধে কেস দিলো ‘ Naxalite infiltration from West Bengal to East Bengal’। ওখানেই খানিক জীবন সাথ্থক করে দিলেন তেনারা। হুলিয়াটা অবশ্য যা হয়েছিল তাতে সত্যমিথ্যা যাচাইএর কোনো সুযোগ ছিলনা। জ্যান্ত অথবা মৃত ধরে দিতে পারলে পাঁচটি হাজার কড়কড়ে! সেই আমলে পাঁচ হাজার যথেষ্ট। শুধু তাই নয়, দেখতে পেলেই গুলি করে মারো অকুস্থলেই! কোনো কথা হবেনা।


ধূম্রকায় অনুর্লঙ্ঘ প্রাচীর এক
জীবন থেকে জীবনের ওপার,
যতবার মুখ রেখে কাঁদতে চাই
মূক রক্তছাপ আঁকে বারবার
কঠিন দেয়ালে।
স্বপ্নের ভেতর স্বপ্ন সত্যসম আসে,
যন্ত্রণায় দীর্ণ হই ছোঁয়ার উল্লাসে।
স্বপ্ন ভেঙে যায়,হায়
প্রচণ্ড বেদনায় বিদীর্ণ হৃদয়
স্মৃতির প্রাচীরে কোটে মাথা
আর একবার,শুধু আর একবার
রক্তছাপ নেওয়ার হুতাশে।

আজ ষষ্ঠপর্ব লিখতে বসে বেদনাহত হৃদয়ের তর্পণ এই কবিতাটি আমার হারানো প্রথম প্রেমের উদ্দেশ্যে।
মতাদর্শগতভাবে তখন আমি একেবারেই কাঁচা। ভাসাভাসা জ্ঞান।
একদিন সন্ধ্যায় আপা, ভাইয়া দুজনেই বাইরে কাজে বেরিয়েছেন। টেবিলের একধারে বসে কপি করছি একটি দলিল। কমরেড তাহের পাশেই টেবিলের আরেকধারে কোনো একটা বই হাতে। হ্যারিকেনের আলোটা সেদিন যেন কিসের অপেক্ষায় দেয়ালে দেয়ালে বড় মায়াময় আলো আঁধারি তৈরী করে রেখেছে। আমার লেখা শেষ হল। কাগজপত্র গুছিয়ে টেবিলের একধারে রাখলাম। তাহের মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন, “হয়ে গেলো”? মনে হ’ল উনি যেন আরো কিছু বলার জন্য অপেক্ষা করে আছেন।
অপেক্ষা তো আমিও করে আছি! আমার জীবনের সবটুকু না বললে তো চলবেনা।
আমি চুপ করে ভাবছি এসব। একটু পরে একটু আলতো ছোঁয়া টের পেলাম আমার হাতের উপর যেটা টেবিলে ওপর রাখা। দেখি তাহের তার হাতের পেনটা দিয়ে ছুঁয়েছেন। সপ্রশ্ন চোখ তুলে তাকালাম। উনি বললেন,
“যদি বলি তোমাকে আমার খুব ভালো লেগেছে?” কেঁপে উঠলাম।
এখনতো আমায় সব বলতেই হবে। বললাম, “আমারো কিছু বলার ছিলো”
“কী?”
“আমার অতীত”
“বলবে? বল,শুনি”
চোখ নামিয়ে নিয়েছি অনেক ক্ষণ। ভিতরে একটু দম নিয়ে বলে গেলাম একে একে সব কথা,খুঁটিয়ে। তারপর চোখ তুললাম।তার দিকে চেয়ে দেখি সেই নির্নিমেষ চোখদুটো আমার উপর ন্যস্ত। আরো মায়াময়, আরো কিছু। মৃদু হাসি ঠোঁটে। আর আমার চোখ দিয়ে নামছে অঝোর শ্রাবণ।অতীতের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে ঐ কিশোরীটির জন্য আমারই বড় মায়া হতো।
ওঁর অমন দৃষ্টির সামনে একটু অস্বস্তি হতে লাগলো।
বললাম, “নিশ্চয়ই ঘৃণা হচ্ছে।তাইনা?”
তাঁর দুটো হাত নীরবে এগিয়ে এলো চোখের জল মুছিয়ে দিতে।বললেন “ঘৃণা? আমার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা দ্বিগুণ হ’ল।” আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি,তার বুকে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কেঁদেছি। কতক্ষণ মনে নেই। প্রথম প্রেমের অনুভূতি দোলা দেয় আজো।
ঐ বাসায় পরিচিত বলতে তাহের। তাঁকে ছাড়া বড় একা লাগতো।তিনি মতাদর্শগতভাবে আমাকে উন্নত করার জন্য হাতে তুলে দিলেন একটি বই, Four Essays On Philosophy.
দেখে বললাম “এতো ইংরেজী। বুঝবোনা তো”।
“ঠিক বুঝবে। আমি আছি তো। বুঝিয়ে দেবো”।
আহা! অসাধারণ বইখানা। যেমন বই, তেমনি শিক্ষক। কি প্রাঞ্জলভাবে বোঝাতেন। On practice and theory, Dialectical materialism কত্ত কঠিন ব্যাপার! অথচ সব বুঝতে থাকলাম।
তাহের ছিলেন জ্ঞানের ভাণ্ডার। তার কারণ তাঁর অপরিসীম পড়ার অভ্যেস। মাঠে বসে বাদাম চিবোলেও বাদামের ঠোঙার গায়ে কি লেখা আছে পড়তেন। বলতেন “যেখানে যা পাবে পড়ে ফেলবে। বাছবেনা । পর্নো পেলে তাও। শুধু কোনটা নেবে আর কোনটা ফেলবে তা তোমার ওপর।”
আজমীদের পরিবার ভারতের আজমগড়ে ছিলেন। ভারতভাগের পর ওঁর পরিবার পূর্বপাকিস্তানে চলে যান। ঢাকায় বাস গড়ে তোলেন। উর্দুভাষী পরিবার। তাহের ইংরেজীমাধ্যমে পড়া। কোনো একটি ইংরেজী পত্রিকায় science column এ লিখতেন। সংগঠনে যোগ দেয়ার পর বাংলা শিখেছেন লিখতে ও পড়তে। অবাঙালী হয়েও বাংলার স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন।


শুরু করলাম আবার সেই গল্প। ভেবে দেখলাম তেমন কোনো কাজ তো সেখানে করতে পারিনি। শুধু ছিলো ঐকান্তিক ইচ্ছে, সাহস আর প্রাণ উৎসর্গ করার প্রতিজ্ঞা। কিন্তু যোগ্যতা না থাকায় আমি কোনো কাজে লাগতে পারিনি। জানি, এ স্মৃতিকথা না লেখার গুণে না ঐতিহাসিক মূল্যে পাঠকের মনে আনন্দ দেবে। শুধু শুরু করেছিলাম সেই দায়বদ্ধতায় শেষ করতে হবে। এবার শুরু করি।
বুড়িগঙ্গার উপরে সদরঘাট। মেলা লোকের ভিড়। তখনকার সময়ে ছোটো ছোটো লঞ্চে করে মানুষ পাড়ি দিত বুড়িগঙ্গার পরে আরো তিনটে নদী। ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা, মেঘনা তারপর কীর্তনখোলা। আজকাল সেতু হয়ে গেছে। প্রচুর লোক ওঠানামা করে যাচ্ছে লঞ্চে। রয়েছে সোরগোল যেমন থাকে। ঘাট থেকে জেটি, তারপর তক্তার উপর দিয়ে লঞ্চে ওঠা। আমার অভ্যেস নেই। তাহের হাত ধরে সাহায্য করে উঠতে। ডেকের উপরে লোকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে বসে জায়গা করে নিয়েছে। আমরা একটা খুঁটির পাশে রেলিং ঘেঁষে বসলাম। মে মাস। বেশ ফুরফুরে একটা হাওয়া দিচ্ছে। নদীর অন্ধকার বুকে ছোটছোটো আলোর বিন্দু দুলছে। ওগুলো জেলে নৌকো। ঐ নৌকো গুলো প্রায় সবটা সময় নদীর বুকেই থাকে। ওগুলোই ওদের সাময়িক সংসার। বেশ গোছানো ঝকঝকে গৃহিণীহীন সংসার।
দুজনের মধ্যে তেমন কোনো কথা হচ্ছেনা। আসলে দুজন এখন এত কাছাকাছি যে পরস্পরের মন এখন একটু পরিসর পেয়েছে মনে হয় কিছু নিজস্ব ধাঁচে ভাবার। তাহেরের চোখে কি ফুটেছিলো সেই মুহূর্তে? এই কিছু মুহূর্ত অম্লান ছেপে থাকে মনের পর্দায়। দেখেছিল এক দৃঢ় এবং গভীর প্রত্যয় যে ভালোবাসতেও জানে। সুফিয়ার মনে কি হয়ে চলেছিলো আজ আর স্পষ্ট করে মনে নেই। তবে অচেনা পরিবেশে তাহেরই যে একমাত্র আশ্রয় সেই নির্ভরতাই মন ভরে ছিল।
5 May একটা প্রতীকী অ্যাকশন করা হয়েছিল। পাকিস্তান কাউন্সিল এবং ইউসিস লাইব্রেরীর উপর হামলা। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও পাকিস্তানী ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে একটা ছোটোখাটো বক্তৃতা, সমস্ত সাধারণ মানুষকে সরিয়ে দিয়ে দেশী মলোটভ ককটেল ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই দিনই তাহের-সুফিয়ার বিয়ে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে অনুমোদন পায়। তারপর আর তাহেরের দেখা নেই। সাতদিন পর যখন তিনি এলেন জানতে পারলাম আমার জীবনের এক নূতন অধ্যায় সূচিত হতে যাচ্ছে।
একটু বিস্ময় জেগেছিল এবং প্রথমে কটু প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। একজন নেতৃস্থানীয় কর্মীর উষ্মা প্রকাশ হয়ে পড়ছিল কারণ সমস্ত ঘরের কাজের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে চাপবে আমি চলে গেলে। যেসব পরিবর্তনের প্রচেষ্টা আমরা নিম্ন স্তরের কর্মীরা দেখাতে পারি, নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে সে প্রচেষ্টা অনেক বেশি হওয়া দরকার। পরে বুঝেছিলাম, প্রত্যেক কর্মীর আদর্শের প্রতি একটা নিজস্ব উৎসর্গের ভাবনা তৈরী হয়, উপরিস্তরের সমালোচনা ও শিক্ষার ফলে। কিন্তু তাদের নিজেদের মধ্যে ঘাটতি থেকেই যায়। সমালোচনা, আত্মসমালোচনা যতটা নিষ্ঠাভরে আমাদের মধ্যে পালিত হ’ত ততটা উপরিস্তরে পালিত হতনা। তাদের মনের গহনে কি নেতৃত্বের মোহ তৈরী হচ্ছিল? এটা আমার একটা হালকাভাবে অবচেতনে প্রশ্ন তৈরী হয়েছিল।
সেই রাত্রে অন্ধকারের গায়ে ফুটে ওঠা আলোর বিন্দুগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম আমার মতো করে সদ্য অতীতটা। ও কি ভাবছিল তা তো জানা আমার। গিয়ে কি ভাবে সব কাজ গুছিয়ে তুলবে।দুজনের চোখই দূরে ছড়িয়ে ছিল।আমাদের ভাবনাগুলো হাওয়ার সাথে যেন উড়ে যাচ্ছে কোথাও।
এখানে কেউ আমাদের আসল পরিচয় জানেনা। তখনকার দিনে পুলিশও তৎপর ছিলনা। তাদের ধারণা ছিলনা অতি সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে যেতে পারে অসাধারণ কিছু মানুষ, তাহেরের মতো। আমার কাছে তো সবই নতুন, ছেড়ে আসা সদরঘাট, এই নদী, এই লঞ্চ, ঐ অন্ধকার জলে দোলায়মান আলোর বিন্দু। ঐসব আলোর বিন্দুগুলি কি কখনো জ্বলে উঠে মশাল হবে?
কিছুক্ষণ পর তাহের লঞ্চের দুলুনিতে ঢুলতে শুরু করলো।আমি ওর গায়ে হাত রেখে বললাম “একটু শুয়ে ঘুমিয়ে নাও না।”
সে বলল “তুমি? তোমার ঘুম পায়নি?” বললাম “না। তোমার তো শরীরটা ভালো নেই”।
তাহেরের হার্টের বেশ ভালোরকম একটা সমস্যা ছিল। ওকে সঙ্গের কাপড়ের ব্যাগটা বালিশের মতো করে দিলাম মাথার নীচে। ও শুয়ে পড়লো। খুব ইচ্ছে করছিল ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে। কিন্তু তখনকার সামাজিকতা সেটা অনুমোদন করবেনা বলে সংবরণ করলাম। রেলিং এর গায়ে হেলান দিয়ে একটু গুছিয়ে বসলাম আঁধার জলের দিকে তাকিয়ে। মনটা বেশ ফুরফুর করছে।মনে পড়ছে এই সেদিনের কথা। পার্টির বাসায় একটু কাজের চাপ ছিল। বেশি পরিশ্রম হলে ঘাড়ের বাঁদিকে একটা জ্বালাধরা প্রচণ্ড ব্যাথা হ’ত। তাহের বোতলে গরমজল ভরে সেঁক দিয়ে দিত যদি চোখে পড়ত আমি ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছি।আমাদের ঘনিষ্ঠতা, ভালোবাসা খুব বেশি কাছাকাছি হওয়ার সুযোগ পায়নি। তাছাড়া তাহের খুবই সংযমী পুরুষ ছিলেন।
মিনিট দশেক হয়েছে তাহেরের ঘুমিয়ে পড়ার। হঠাৎ মনে হল ও কিছু বলছে। ভালো করে ঠাহর করার চেষ্টা করলাম। দু এক মিনিট পর ওর কথা স্পষ্ট হয়ে উঠলো। আমি নীরবে শুনছিলাম আবার একটু হাসিও পাচ্ছিল।তাহের বোঝাচ্ছিলো Theory of knowledge. স্পষ্ট উচ্চারণে। ঘুমিয়ে কথা বলছে বোঝে কার সাধ্যি! বেশ অনেকক্ষণ বলার পর হঠাৎ জেগে উঠে বসল। আমার মুখে মিটিমিটি হাসি দেখে জিজ্ঞেস করলো, “হাসছো কেন?” বললাম ,”তুমি ঘুমের মধ্যে কথা বল?” এবারে ও হেসে ফেলল। “হ্যাঁ, সবাই তাই বলে। ভারি মুশকিল, বুঝলে। কোনো অচেনাদের মধ্যে থাকলে এই জন্যেই ধরা পড়ে যাবো কোন দিন।” বললাম, ” কোথাও একলা যাওয়া চলবেনা তোমার।”
“আচ্ছা, কি বলছিলাম বলতো।”
“Theory of knowledge” বোঝাচ্ছিলে।”
“কতটা বলেছি?” খেই ধরিয়ে দিতে জেগে বসে বাকীটা বুঝিয়ে শেষ করলো।
লঞ্চ বুড়িগঙ্গা থেকে, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষা, মেঘনা, কীর্তনখোলা হয়ে বরিশাল ঘাটে পৌঁছে গেল যখন, তখন পুবগগনে নূতন ভোরের সূর্যোদয় হচ্ছে।


তা
হের ঘাটে নেমে একজনের সাথে কথা বলছে। আমিও নেমে এলাম। জানলাম ছেলেটির নাম জলিল। ছেলেটি আমাদেরকে রিক্সায় উঠিয়ে দিয়ে নিজেও রিক্সায় চলল। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর রিক্সা দুটিকে ছেড়ে দেওয়া হল।পাকা সড়ক দিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটার পর বাঁয়ে মোড় নিয়ে একটা কাঁচা সড়কে নামলাম। বেশ খানিকটা হাঁটার পর কলাগাছের ও আরো নানারকম গাছের ঝোপে ঘেরা একটি বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম। মাটির মেঝে। অর্ধেক কাঠ, অর্ধেক টিনের ঘর উপরে টিনের চাল । সামনের ঘরখানি লম্বা ভিতরে একটা বড় ঘর, পাশে একটা ছোট ঘর। সেই ঘরটির জানালর ধারেই একটা পুকুর। ঘাটখানি সুন্দর ছোট ও বাঁধানো। জানালায় দাঁড়ালে পুকুরের ঠাণ্ডা হাওয়া এসে ঝাপটা দেয়। বড় ভালো লেগে গেল আমার। ঘরে আলনা চৌকি সব আছে, বাড়িওয়ালারই। জলিল আগে থেকেই স্টোভের ব্যবস্থা করে রেখেছিল। বাইরের কাপড় ছেড়ে তৈরী হয়ে নিলাম। ভাত, ডাল, আলুসেদ্ধ চটপট হয়ে গেল। খাওয়াদাওয়ার পর তিনজন মিলে অনেক কথাবার্তা হল বরিশাল নিয়ে। তাহের সব জেনে নিল ওখানকার পরিবেশ পরিস্থিতি সম্পর্কে।
ঐদিন আমাদের প্রথম সন্ধ্যা । ভেতরে কি যেন চলছে। অজানা কি যেন। ও লেখা নিয়ে ডুবে আছে। ঘরে হ্যরিকেন জ্বলছে। কিছু পরে সে বেরিয়ে গেল বাইরে। বলল একটু হেঁটে আসছি। আমি একটু পরে খাবারের আয়োজন করলাম। দিনেই বেশি করে একটু করে রেখেছিলাম। সে ফিরে আসার পর খাবার খাওয়া হল। ধীরে এগিয়ে আসছে রাত্রি। প্রথম রাতের প্রথমভাগ কেটে গেল নানা কথাবার্তায়।
সে বলে, “দেখ, আমরা মুক্তমনা মানুষ। একজন মানুষের চিরকাল একজনকেই ভালো লাগবে এমন কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই। আমাকে তোমার একসময় ভালো নাও লাগতে পারে, অন্য কাউকে ভালো লাগতে পারে। তুমি কিন্তু আমায় বোলো। তখন আমরা দুজনের বন্ধু।”
আমি স্তব্ধ হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। “তার মানে এটা তোমার ক্ষেত্রেও আমার মানতে হবে?” ও জোরে হেসে ফেলল। আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল “এত সিরিয়াস হওয়ার কিছু নেই। আমি আপাতত এটুকু বলতে পারি, কম তো দেখিনি, তোমার মতো সবটুকু অধিকার করার মতো কাউকে পাইনি। শুধু সম্পর্কের মধ্যে একটা খোলা হাওয়া বইয়ে রাখলাম এবং এটা আমার দিক থেকে তোমার জন্য শতভাগ ছাড়।”
আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়া গেল।আলো আঁধারীর মায়া জড়িয়ে নিলো দুটি ভালোবাসার ছায়া। জানালা দিয়ে চাঁদ খানিক আলো গড়িয়ে দিলো ওদের গায়ে। মায়াময় ঐ রাতগুলিই ছিল শুধু জীবনে তাদের। রাতও কেটে যায়। মায়াশরীর ছেড়ে জীবন ডাক দেয় প্রতিদিন ভোরে। সকালে ঘুম ভাঙে আর হাসিমুখ ঝলকে ওঠে। রোদও লজ্জা পায় সেই আলোকে। আজ স্মৃতিতে সেই আবিলতা নেই, তবু বুকের ভেতরটা গুমড়ে কেঁদে ওঠে। সকালে বেরিয়ে গিয়ে তাহের কখন ফিরে আসবে, ঝোপের ভেতর দিয়ে চোখ পেতে রাখা বিন্দু থেকে পূর্ণাবয়ব হয়ে উঠবে মানুষটার চেহারা, আপাতত এই ছিল অচেনা পরিবেশে আমার কাজ।
পরে বরিশাল শহরে কোথায় কি করেছি স্পষ্ট মনে পড়েনা। তখনকার কয়েকজনের মুখে শুনলেও আজ মনে করতে পারিনা একটুও।
বরিশালের একটা বৈশিষ্ট চোখে পড়েছিলো। ঢাকা থেকে সম্পূর্ণ অন্যরকম একটা ছোটো শহরের সংস্কৃতি। এখনকার ঢাকায় যেরকম ধর্মের জিগির, তখনকার ঢাকায় তার সিকিভাগও ছিলো কিনা সন্দেহ। আর বরিশালকে সেই জায়গায় পাকিস্তানের কোনো অংশ ভাবতে ভুলে যেতাম। এই শহরের মানুষের আধুনিক মানসিকতা, পড়াশুনা, মুক্তচিন্তা, সংগ্রামী চেতনা ছিলো চোখে পড়ার মতো। অবশ্য বরিশালের ইতিহাসও তাই বলে। ঢাকায়ও তখনকার দিনে বোরখার তত চলছিলনা যত এখন হয়েছে। বরিশালে দেখিইনি কখনো। সমস্ত শহরটাই মনে হত আমার বাড়ি।
দুজন কর্মী বোমা বানাতে গিয়ে বোমা ফেটে যায়। একজন আহত হয়ে ধরা পড়ে। সে আমাদের আস্তানা চিনতো। ফলে সে বাসা ছেড়ে অন্যত্র বাসা নেয়া হল। সেখানেও টিকটিকি পেছনে লাগায় ছাড়তে হল। এরপর কল্যাণকাঠিতে কিছুদিন কাজ করতে গেলাম। সেখানে আপা ও ভাইয়াও এসেছিলেন। একটি পার্টি কংগ্রেস আয়োজিত হয়েছিল। একটি বড় বজরা ভাড়া করা হয়েছিল। দুলুনি এমন, আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম বমি করতে করতে।
বাসাটি ছিল এক কমরেডের। কল্যাণকাঠির বৈশিষ্ট হল একটি বাড়ির ভিটে থেকে পাশের বাড়ি যেতে হলে নৌকো করে যেতে হ’ত। ভিটেটুকু ছাড়া বাকীটা নীচু ধান জমি আর সারা বর্ষাকাল জলে ডোবা। তবে এই সময়েই যাতায়াতের নাকি সুবিধে। অন্য সময় হয় হাঁটা নয়তো গরুর গাড়ি ভরসা।
কমরেড রাসেলের মা ভারিক্কি চেহারার মানুষ। খুবই স্নেহশীলা। ঘোর বর্ষা দেখে তিনি একদিন হাঁসের মাংস আর খিচুড়ি খাইয়ে ছিলেন।
তাহেরের হার্টের ব্যাপারটা সকলেরই চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ালো। আমরা ঢাকায় ফিরে এলাম । ভাইয়া তাহেরের ব্যাপারে খুবই চিন্তিত ছিলেন। গভীরভাবে ভালোবাসতেন তাকে। একটা গভীর হৃদয়ের যোগ ছিল তাঁদের মধ্যে।
ঢাকায় ফিরে তাহেরকে ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করলেন ভাইয়া। নানা পরীক্ষার পর একটি পরীক্ষা বলা হল ঢাকা মেডিকেল কলেজে করাতে হবে। সেটা আবার তাহেরের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকির ব্যপার স্বাস্থ্যের দিক থেকেও আবার নিরাপত্তার দিক থেকেও।
তাহেরকে বিশিষ্ট হার্টস্পেশালিস্ট ডা: ফজলে রাব্বি কে দেখানো সাব্যস্ত হল। নির্দিষ্ট দিনে তাহেরকে নিয়ে যাওয়ার ভার পড়লো আমার উপর, দেহরক্ষী হিসেবে। আমাকে যথারীতি বোরখা পরতে হল। প্রথম অস্ত্র হাতে উঠলো। ছটা টাটকা কার্তুজভরা একটা কালো ঘোড়া। সেটা বোরখার ভেতরে কোমড়ে গুঁজলাম। মেডিকেলে ডাক্তারের ওখানে গিয়ে দেখি প্রচুর রোগীর ভিড়। আমাদের চলাচলে যতটা ঝুঁকি ছিলো তার চেয়ে একটি জায়গায় বেশিক্ষণ থাকাটা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তাই একটু অপেক্ষা করতে হবে দেখে নম্বর স্লিপ নিয়ে কোণের দিকে একটা জায়গায় বসলাম। তবে আমি বেশি সময়টা ওকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। যখন ডাক এলো চেম্বারে ঢুকলাম।সামনের চেয়ারে বসলাম। দেখলাম অসম্ভব সুদর্শন দীর্ঘদেহী একজন মানুষ। ডাক্তার একজন অবাঙালী। তাহের তার সমস্যার কথা বলল। ডাক্তারসাহেব শুনে সেই একই কথা বললেন। মেডিকেলে ভর্তি হতে হবে। এইবার তাহের তাঁকে সব কথা বলতে বাধ্য হল।
“আমার একটু অসুবিধে আছে ভর্তি হয়ে থাকা”
“কেন? কি অসুবিধে?”
তাহের একবার আমার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করলো। তারপর বলল, “আমার বিরুদ্ধে arrest warrant আছে।”
“what!”
“হ্যা, ডাক্তারসাহেব। পাকিস্তান কাউন্সিল ও ইউসিস লাইব্রেরীর উপর অ্যাকশনের। তাছাড়াও এই সংগঠনের সমস্ত কর্মীদেরই এই বিপদ”।
ডাক্তারসাহেবের চোখ ছানাবড়া!
“কোন সংগঠন? আপনাদের উদ্দেশ্য কি?”
“পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন। পূর্ববাংলার স্বাধীনতা।”
“Oh, god! ইনি?”
“আমার স্ত্রী, একই পথের পথিক।” তাহের হাসতে হাসতে বলে।
“ওনার নামেও?”
“হ্যাঁ,ডাক্তারসাহেব”।
ডাক্তার সাহেব ঝটিতি হাত রাখেন বেলের উপর, আর ততোধিক ঝটিতি আমার হাত বোরখার ভিতরে ঠাণ্ডা হাতলের উপর। যেভাবে হোক তাহেরকে বাঁচিয়ে বের করে নিতে হবে। বেল শুনে বেয়ারা এলো। ভাবছি বলবেন “পুলিশকে খবর দাও।” না । বললেন “এই সাহেব আর মেমসাহেবকে ভালো করে দেখে চিনে রাখ। এর পরে আসলে কোনো স্লিপ দেবেনা। সোজা চেম্বারে ঢোকাবে, বুঝলে? যাও।”
“আপনারা করেছেন কি? এতক্ষণ ধরে বাইরে বসে আছেন?”
ডাক্তার সাহেব পিঠ সোজা করে বসলেন। স্মিত উজ্জ্বলমুখে বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন আমাদের দিকে। বললেন, “আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিনা। এমন মানুষকে সামনাসামনি দেখার সৌভাগ্য হবে ভাবিনি কখনো। স্মরণীয় হয়ে থাকবে”।
একটা কটু মুহূর্ত কেমন করে ভালোবাসার মুহূর্তে, একটা চরম অবিশ্বাসের মুহূর্ত বিশ্বাসের মুহূর্তে পরিবর্তিত হয়ে গেল। আলোঝলমল চারিদিক। বাতাসে ওষুধের নয় যেন কোন অজানা ফুলের সুবাস। হাত কখন ঐ ভয়ানক জিনিসের উপর থেকে সরে গেছে টেরই পাইনি।
আর ডাক্তার বলছিলেন স্মরণীয় হয়ে থাকবে,আজ আমি হতভাগিনী ঐ দুজনকে স্মৃতির পাতায় স্মরণ করছি ,হায়! 14 ডিসেম্বর, 1971 অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের সাথে ডা: ফজলে রাব্বিকেও হত্যা করেছিল ঔপনিবেশিক শক্তির দালালরা।


কিছু কথা কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। যাবারই কথা। জানি এ কথার কোনো মূল্য নেই। মৃত অতীত নিজে কিছু বলতে পারেনা। আমি যা বলতে যাচ্ছি এখন, পাঠক তার প্রমাণ চাইতেই পারেন। আমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই। ইচ্ছেও নেই প্রমাণ করার। শুধু বর্ণনা করার কথা তাই করছি।
ঢাকা ছেড়ে চট্টগ্রাম যাবার আগের কথা। নেতৃত্ব নির্দেশ দিলেন স্বাধীন বংলার পতাকা প্রণয়ন করার জন্য।
পতাকার কথায় প্রথমেই মনে আসলো জাপানের পতাকাটির কথা। সাদা জমিতে লাল বৃত্ত। খুব সহজ , ছিমছাম। তাহেরের সাথে আলাপ করে নিলাম। তৈরী হল সবুজ জমিতে লাল বৃত্ত। সবুজ শ্যামল বাংলার প্রতীক এবং লাল বৃত্ত উদীয়মান সূর্যের প্রতীক। আবার লাল কমিউনিজমের প্রতীক।আবার পরে লাল সূর্যের মাঝে বাংলার মানচিত্র দেওয়ার কথা হল ও সেটাও তৈরী হল। পরে ভাবা গেল যে পতাকা এমন হওয়া দরকার যেটা জনগণ সহজেই সঠিক আকারে তৈরী করতে পারেন। মানচিত্র সহজ নয়। পরে ওটা বিকৃত আকার ধারণ করতে পারে। তখনকার মত সেটা বাদ গেল।
পরে কোনো একটি বৈঠকে নেতৃত্ব এই পতাকার একটি খসড়া পেশ করেন। বৈঠকটি শুনেছি ছিল অন্য কয়েকটি দলের সাথে।
এবার চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামে হালিশহর নামে একটি অবাঙালী মহল্লায় আমরা একটা বাসা ভাড়া করলাম। জায়গাটা সমুদ্রের মাইলখানেক দূর নাকি কতখানি জানিনা। অবাঙালীদের কলোনী। দুটো কামরা, মাঝখানে একফালি বারান্দা। সেখানে রান্নার ব্যবস্থা হল। কলঘর আর ল্যাট্রিন একটুদূরে। পুরো জায়গাটা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। প্রথমে আমি, তাহের ও শহীদভাই ছিলাম। পরে আসে দুলু ও রায়হান। দুলু ছিল তাহেরের একেবারে যাকে বলে ন্যাওটা। শহীদভাই এক অদ্ভুত মানুষ ছিলেন। একদম ভুলোমন। চোখে পুরু লেন্সের চশমা। বাইরে যাবার সময় ঠিক পায়ে হয় উল্টো চটি নয়তো এর একটা ওর একটা পরে রওনা দেবেন। চিৎকার করে দাঁড় করাই, চটি ঠিক করাই। শার্টের বোতাম, একটা ওপরে একটা নীচে হয়ে থাকবে। সেটা খুলে ঠিক করে লাগিয়ে দিই বকুনি দিতে দিতে। উনি বাচ্চার মতো হাসতে থাকেন আর বলেন, আহা, তাতে কি হইল!! মহা তাত্বিক লোক। অনুশীলনে বড়ই অলস।
ওখানে ঐ মহল্লায় তাহেরের পরিচয় ছিল একজন অবাঙালী সাংবাদিক। সে মাঝে মাঝেই বাইরে যায়। এটা সবাই দেখে। আবার ভাষার কারণে ওদের সাথে তাহেরের বেশ ভাব জমে যায়। সবাই বেশ সমীহ করে তাকে।
একদিন সন্ধায় ঘরে বসে আমি আর দুলু কথা বলছি। হঠাৎ শুনি জলের কুলকুল শব্দ, ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। কি হ’ল? জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে চমকে উঠি। একি! আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। বৃষ্টি নেই , বাদলা নেই। এত জল! কোথা থেকে এল। চারিদিকে জল থৈ থৈ। চাঁদের আলো পিছলে যাচ্ছে। আমি তো সভয়ে চেঁচিয়ে যাচ্ছি বাইরে মুখ করে। পাশের বাড়ির কর্তা বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। “আরে ভাবীজী, ভয়ের কুছু নাই। হর পূর্ণিমাতে সমন্দরসে পানি চলে আসে জোয়ারে। খানিক বাদ নেমে যাবে।” ভাবি কত কিছু জানা বাকি! এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।
তখন খুব কম পয়সায় বিপ্লবী সংসারটাকে গুছিয়ে চলতে হ’ত। আলু সেদ্ধ ভাত। মুখ ফেরাতে কখনো পাঁপড়ভাজা ডাল সহযোগে। আবার কখনো নতুন রেসিপি আলুসেদ্ধ পেঁয়াজ, লঙ্কা, একছিটে তেল, একটা ভাজা পাঁপড় তাতে ভেঙে দিয়ে মাখা। তাতে কম খরচায় আনন্দে চলে যেত।
কিছুদিন পর ঢাকা থেকে তাহেরের ডাক এলো। সে চলে গেলো। আমাদের বাসাটা ছিল কলোনীর শেষ প্রান্তে, পেছনের দিকে। একদিন সন্ধ্যায় দেখলাম কলোনীতে সাজসাজ রব। কোথা থেকে সব টাঙ্গি তরোয়াল, রড, সড়কি এসে জড়ো হচ্ছে উল্টোদিকের বাসাটায়। দুই বাসার মাঝে গলিটা হাত বার-তের চওড়া হবে। সেখানে দেখি পাশের বাড়ির অবাঙালী ভদ্রলোক কয়েকটি কিশোরকে নিয়ে লাঠি, সড়কি, তরোয়াল ঘোরানো শেখাচ্ছেন। একটি ছেলের মাথায় চাঁটি মেরে বললেন, ” তুমলোগোনে ডাণ্ডাগোলী খেলতে হো, হমারে বচপনমে হম লাঠি চলানা শিখতে থে। অ্যায়সা লাঠি ঘুমায়েঙ্গে কি গোলি ভি আরপার নেহি হো পায়গা। ইয়ে দেখ.. অ্যায়সে এক হাথমে সোর্ড পকড়না হ্যায় ঔর ইয়ে বাঁয়া হাথমে রড পকড়। ইয়ে রড তেরা ঢাল বনেগা,অ্যায়সে ঘুমানা হ্যায় ইসকো।” বলে সেই রড ঘুরিয়ে দেখালেন। বুঝলাম সেদিন কেন বলছিলেন, “আরে, আমরা যুঝতে জনম লিয়েছি। যুঝতে যুঝতে ওদেশ থেকে জান বাঁচিয়ে এদেশে এলাম। এখানেও শান্তি নেই। এখন এখানেও যুঝতে হোবে।” এখানে শুরু হল বাঙালী অবাঙালীদের মধ্যে দাঙ্গা।
বিভিন্ন দেশের সীমানা, ভূমির সীমানা নিয়ে লড়াই হয়। সাধারণ মানুষ ছিন্নমূল হয় বারবার। বারবার মরে। মানুষের কথা কেউ ভাবেনা। আজও চলেছে সেই একই দৃশ্য সারা পৃথিবীজুড়ে। আরো নৃশংস হয়েছে পথ আর পদ্ধতি।
মহল্লার মেয়ে বউদের তুলে দেওয়া হয়েছে ছাদে থান ইঁট আর গরম জলের হাঁড়িসহ। এই সেই ছিন্নমূল জনগণ। এঁদের কি দোষ? প্রাণ বাঁচাতে এই ভাবে লড়ে এক দেশ থেকে ছুটে যায় আরেক দেশে।
এদিকে আমাদের ঘরে একটি বাক্সে চোদ্দটি তাজা হাতবোমা সযত্নে রাখা। আগুনের কবলে পড়লে শুধু আমরা কেন আশপাশের কয়েকটা বাড়ি উড়ে যাবে। আমাদেরকে নানারকম এক্সপ্লোসিভ বানানো শিখিয়েছিলেন তখনকার দিনের বিশিষ্ট ফার্মাশিস্ট ডক্টর আবদুল হাই। মলোটভ ককটেল যা একটি বোতল মাত্র। কিন্তু ছুঁড়ে মারলে বোতল ভাঙলেই আগুন লাগবে। দেশি রকেট, এমনকি প্লাস্টিক বম্বও। যাই হোক বোমা ভর্তি বাক্স এখন বুমেরাং। দুশ্চিন্তায় রাত কাটতেই চায়না। হাতে মাত্র আড়াইটা টাকা। এখানে বিপ্লব করার আগেই দুর্ঘটনায় শেষ হয়ে যাব। পরদিন পেটে খিদে জ্বলছে। সঙ্গের বাচ্চা ছেলেটা খেতে চাইলে বললাম, “হাতে যা টাকা আছে, খরচ করা যাবেনা। কোনোভাবে এখান থেকে বেরোতে হবে।” আমরা চলে যাব শুনে পাশের বাড়ির বাড়িওয়ালা ভদ্রলোক ছুটে এলেন। “ক্যা কর রহেঁ হ্যাঁয় আপ? যাবার কি দরকার? ভাইজী এখানে নেই তো কি হল? আমরা আছি তো। জান থাকতে আপনাদের গায়ে আঁচ লাগতে দেবনা।” মনে মনে বলি, “আর আঁচ! এদিকে ঘরে বিপদ নিয়ে আটকে আছি,তুমি আর কি বুঝবে?” বললাম,”ভাইজান, আমাদের এক আত্মীয় ডেকেছে। আপনার ভাইজী আসলে আপনার সাথে দেখা করে নেবে। যা বলার ওকে বলবেন।” ক্ষুণ্ণ মনে ছাড়লেন। তবে বাইরের বিপদের কথা বারবার বলতে লাগলেন। উনি জানেন না কত বড় বিপদ এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
এদিকে বেবিট্যাক্সিওয়ালারাও আসতে চাইছেনা ভিতরে। অনেক বলে কয়ে রায়হান একজনকে নিয়ে এল। সেই বাক্স সাবধানে তুলে নিয়ে আমরা সোজা গেলাম চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ। সেখানে এক হাউসস্টাফ শিক্ষার্থী আমাদের সহানুভুতিশীল ছিল। হস্টেলের দোতলায় তার ঘর। বাক্সটাতে কাঁচের জিনিস আছে বলে অতি সাবধানে তুলে তার খাটের নীচে চালান করা হল। কাঁচের জিনিস বলা হল দারোয়ানটিকে যে তুলতে সাহায্য করেছিল। মহিলা ডাক্তারটি জানতেন। পরে সেটি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল তাহের ফিরে আসার পর।

১০
একটু পিছিয়ে যেতে হ’চ্ছে। সেই বরিশাল যাবার আগে তাহেরের মা,বাবা আর সব চেয়ে ছোট ভাই আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন মহম্মদপুরে (ঢাকা) এক বাসায় পুলিশের চোখ এড়িয়ে। বাসাটি ছিল তাহেরের এক বড় বোনের। তাঁকে আমি বাজী বলতাম। তাহেরের মা এবং বাবা পরস্পরকে ভীষণ ভালোবাসতেন। কিন্তু ধর্মবিশ্বাসের ব্যাপারে দুজন একদম বিপরীত। আম্মা আব্বাকে নাস্তিকতার জন্য খুব বকতেন। আম্মি আমার জন্য এক সেট গয়না নিয়ে এসেছিলেন নতুন বৌকে দেবেন বলে। গল্পটল্প করার পর তিনি আমাকে নিয়ে বসলেন। আব্বা তো বুঝে ফেলেছেন কি হতে যাচ্ছে। মুচকি মুচকি হাসছেন। আম্মা একখানা টুকরো কাগজ নিয়ে আমাকে পাশে বসিয়ে বললেন, “পঢ়ো।”
দেখি কাগজে আরবী ভাষায় কিছু লেখা। এইরে! সেরেছে!
কাঁচুমাঁচু মুখ করে বললাম, “আমি আরবী পড়তে জানিনা। মুঝে নেহি আতা”।
আম্মাতো রেগে কাঁই। বললেন, “ক্যায়সা মুসলমানকে ঘরকে লড়কি হো এক সুরা ভী নেহি পঢ় সকতে হো?”
খাটের উপর তাহের আর আব্বা বসেছিলেন।
তাহের শুনে বলে, “উউউঃ! নিজের ব্যাটা কত বড় মুসলমান!”
আম্মা, “চুপ হো যা বদমাশ। হোগা কিঁউ নেহি। উও দেখো বুড্ঢা ক্যায়সা হঁস রহা হ্যায়। এক পাঁও কব্বরমেঁ চলা গয়া। ফিরভি আল্লাহ্ কে নাম নেহি লেতা হ্যায়। আরেদোজখ নসিব হোগা দোজখ। অভি ভি ওয়ক্ত হ্যায় সুধর যাও।”
আম্মা বকতে থাকেন, আব্বা হাসতে থাকেন।
এর পর একটা লাল কাপড়ে জড়ানো তাবিজ দিয়ে বললেন তাহেরের হাতে বেঁধে রাখতে। তাতে নাকি ওর কোনো বিপদআপদ ধারেপাশে ঘেঁষবেনা। নিয়েছিলাম মায়ের আকুতি, ভালোবাসা, আশীর্বাদ মাখা সে তাবিজ। সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলাম বরিশাল। সেই গয়না পরে পার্টির ফাণ্ডে দেওয়া হয়। শুনেছি সেই গয়না দিয়ে পার্টির প্রথম ফাণ্ড তৈরী হয়।
বাঙালী-বিহারী দাঙ্গার কবল থেকে বাঁচা গেল। তাহের ঢাকা থেকে ফিরে এলো। আমরা আশ্রয় নিলাম মেহেদীবাগে ইঞ্জিনীয়রদের মেসে। 7ই মার্চ শেখ মুজিবের ভাষণের পর সমস্ত দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হল। অসংগঠিত জন অভ্যুত্থান। কাঠের বন্দুক কাঁধে নিয়ে পল্টন ময়দানে যুদ্ধের মহড়া চলছে। যুদ্ধের প্রকৃত প্রশিক্ষণ নেই, নেই যথাযথ সেনানায়ক। আমাদের রণনীতি রণকৌশল কাজে লাগাবার সময় রইলো না। কারণ তা ছিল দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম। গেরিলাযুদ্ধ। গ্রাম থেকে ধীরেধীরে এগোনো। এই সঠিক সংগ্রামের সফলতা সম্পর্কে শত্রু সচেতন ছিল বলেই আমাদের উপর ছিল শ্যেণদৃষ্টি। যুবকদের মধ্যে প্রাণ বিসর্জনের উদ্দীপনা। খানসেনাদের দৌরাত্ম্য বেড়ে গেছে।
আমাদের অবাক করে দিয়ে সারাবাংলায় উড়ছে আমাদের তৈরী দুইরকম পতাকাই।
মেসে দু’তিনরাত কাটাবার পর একরাতে গোলাগুলি চলতে শুরু করলো। রাত হলেই শুরু হ’ত। সকালে থামতো। এমনি এক রাতে দরজায় ধাক্কা পড়লো। সবাই শঙ্কিত। শেষে পেছনের জানালার কাছে এসে কেউ বলল, “আমরা এয়ারফোর্স থেকে পালিয়ে এসেছি দুজন। আমরা আশ্রয় চাই।” তখন বিভিন্ন পাকিস্তানী ফোর্স থেকে বাঙালী সৈনিকরা ফোর্স ছেড়ে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করছিল।
দরজা খুলে দুজনকে ভেতরে নেওয়া হল। এদিকে জোর গুলিবর্ষণ শুরু হল। কোথা থেকে এই ঘটনাটা ঘটছে কেউ বুঝতে পারছেনা। যাই হোক সেদিনের গুলি কয়েকটা জানলা ভেদ করে ফেলল। সবাই যে যেখানে পারে শুয়ে পড়েছে। আমি, তাহের খাটের নীচে। যে দুজন ফোর্সের লোক ছিলেন তাদের একজনের নাম শাহজাহান আরেকজন মির্জা। মির্জা খাটের উপরে ছিল। কেউ ডাইনিংটেবিল ঘরের কোনায় কাত করে তার পেছনে। কেউ আলমারি টেনে তার পেছনে।
খাটের উপর মির্জা নড়লেই পুরোনো খাট মচমচ শব্দ করে উঠছে। কারণ সে ছিল বেশ মোটাসোটা ভারী ওজনের লোক। নীচ থেকে আমি শংকিত হয়ে বলি, “মির্জা ভাই, বেশি নইরেন না। খাট ভেঙ্গে পড়লে আমাদের দুইজনের মরণটা খুব লজ্জার হবে। তার চেয়ে গুলি খেয়ে মরাটা ভালো না?”
সবাই যে যেখানে ছিল হেসে উঠলো। রাতটা তো ঐ ভাবে ভয়ে গল্পে কেটে গেল। আসলে ঐ সময়ে গোলাগুলির আওয়াজে মানুষ ক্রমশ এমন অভ্যস্ত হয়ে উঠছিল যে যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পরে মানুষের ঘুম আসতোনা। অস্বস্তি হ’ত। মানুষের অভ্যাস এমনই একটি ব্যাপার যে খুব অপ্রিয় জিনিসের সঙ্গে বাস করতে করতে সেটার অনুপস্থিতিও ভালো লাগেনা।
পরদিন সকালে দেখি সামনের একটি চারতলা দালানে লোকজন হৈ হৈ করে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। আমরা জানতাম ঐ বাড়িটায় বেশ কিছু কাবুলিওয়ালা থাকে। আফগানদের মত পোশাক। বাড়ির পুরো নীচতলাটায় গাড়ি পার্কিং এর জায়গা। লোকেরা উদ্ধার করেছে ঐ বাড়ির বেসমেন্টে নাকি বিশাল পরিমাণে অস্ত্র মজুদ করা আছে। ঐখান থেকে রাতে নাকি ওরা গুলি চালায়। সত্য মিথ্যা তখন কে যাচাই করবে? লোকজন মিলে বাড়িটা ঘেরাও করে নীচতলা থেকে সব গাড়ি বের করে ফেলল। তারপর টায়ার টিউব আরো নানা দাহ্য পদার্থ বাড়ির নীচতলায় ঢুকিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলো। বাড়ি দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো। লোকজন যারা ভেতরে ছিল কেউ পুড়লো, কেউ ওপর থেকে লাফিয়ে বাঁচার চেষ্টা করলো। কাউকে দেখলাম আধপোড়া শরীর নিয়ে জানালায় ঝুলছে।
এর মধ্যে খান সেনারা রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিয়েছে। মির্জা সকালেই বেরিয়ে গিয়েছিল। পরে খবর পেলাম একটি পরিবারকে এলাকা থেকে বের করতে গিয়ে সবশুদ্ধ বড় রাস্তায় মারা পড়েছে। শাহজাহান কাবুলিওয়ালাদের গাড়িসম্ভার থেকে একটা টয়োটা গাড়ি বের করে আনলো। পাড়ার কয়েকটি কিশোর যারা খানসেনাদের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল , আমি আর তাহের প্রায় জাপটে ধরে টেনে এনেছিলাম, তাদের কয়েকজনকে এবং পারভীন নামে চাঁদপুরের একটি মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ঐ গাড়ি করে নানা রাস্তা ঘুরে বেরোতে পেরেছিলাম। গাড়ি চলতে চলতে পাহাড়তলি তে গিয়ে থামল। থামতে বাধ্য হ’ল। গাড়ির তেল শেষ। এখান থেকেই আমরা পায়ে হাঁটা শুরু করলাম। শাহজাহান অন্যপথে কোথায় চলে গেল আজ আর মনে পড়েনা।

১১
পাহাড়ে বালির চরে একাকার হয়ে যাওয়া পাথরে বালিতে
কাকে নির্বাচন দেবে সে কথা বোঝার আর সামর্থ্য ছিলনা
তাই সে কপিশ এই ব্যর্থতার চেয়ে আরো ব্যর্থতায় ভাঙা
আত্মইতিহাস থেকে গড়ে তোলে শাপগ্রস্ত দিনের জড়োয়া।

[শঙ্খ ঘোষ]
পাহাড়তলি থেকে আমরা হেঁটে রওনা হলাম। রামগড়, শাব্রুমের সীমান্তের দিকে। জঙ্গল-পাহাড়ের ভিতর দিয়ে চলেছি। সংগঠন, নেতৃত্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। তখন তো ফোন ছিলনা। এই যাত্রাটা ভুল ছিল। তাহের এবং আমরা পরে তিরস্কৃত হয়েছিলাম। টিকে থাকতেই হত।
পাহাড়ের কাঁকুড়ে পথে খালি পায়ে চলতে চলতে যন্ত্রণা হচ্ছিল। যে পথ দেখাচ্ছিল সেইই শুধু পথের দিকে তাকিয়ে ছিল। আমরা পর পর সামনের জনের পায়ের দিকে তাকিয়ে যন্ত্রের মতো হাঁটছিলাম। অবিশ্বাস্য দূরত্ব অতিক্রম করছিলাম একেক দিনে। পাহাড়ে গ্রামে রাত কাটাচ্ছিলাম। রাতে পাহাড়ি মোটা সুতোয় বোনা শতরঞ্চি-সদৃশ ঢাকা গায়ে দিয়েও ঠান্ডা কাটছিলো না। পিঠে পিঠ লাগিয়ে পরস্পর উষ্ণতা ভাগ করে নিতে হচ্ছিল। গ্রামে সভা করা হচ্ছিল মাঝে মাঝে খুব সাবধানে। কতদিনে পৌঁছেছিলাম বর্ডারে মনে নেই। রামগড়ের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে একটা ছরা পার হয়ে ওপারে মানে ভারতে শাব্রুমে পৌঁছলাম। এক বাড়িতে আশ্রয় পেলাম। একটাই বড় ঘর। দুপুরের পর ওপারে শুরু হল মর্টার শেলিং। গ্রামের লোকজন ভয়ে ছরা পার হয়ে দলে দলে ঐ বাড়িতে এসে উঠলো। ঘরটা ছেড়ে দিতে হ’ল। গিয়ে উঠলাম পাশের পুকুর পাড়ে।
বিএসএফ ক্যাম্প ছিলো অদূরেই। তারা আমাদের আসার খবর পেয়ে ডেকে পাঠায়। তাহের আমাকে পাঠায় কথা বলার জন্য। সঙ্গে যায় পারভিন। অফিসার বেশ ভদ্র ব্যবহার করে যুদ্ধে সহায়তা করার কথা বলেন। আমাদের দাবী ছিল শর্তহীন সহায়তা। জানতাম তারা রাজী হবেনা। কম কথায় কাজ সেরে চলে এসেছিলাম।
দুপুরে ঐ বাড়িতে সবার জন্য লঙ্গরখানার ব্যবস্থা হয়েছিল। ঝিঙে আর হ্যালেঞ্চা শাক দিয়ে ঝোল আর ভাত। দুপুরে ভাত খেয়েছিলাম তাই দিয়ে। প্রচণ্ড তেতো। রাতেও তাই। শহিদ ভাইএর গায়ে জ্বর। পুকুরপাড়ে ছন জমা করে রাখা ছিল। কিছুটা নামিয়ে শহিদভাইকে সেখানে শোয়ানো হ’ল। আর বাকী ছন দিয়ে তাকে ঢেকে দেয়া হ’ল। তারপর আমাদের পালা। আমার ঝোলায় দুটো শায়া শাড়ি ছিলো। পারভিনের বুদ্ধিতে শায়াদুটোর কোমরের দড়ি টেনে টাইট করে বেঁধে তার একটার ভেতর নিজে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঢুকে পড়লো। আরেকটাতে আমি। শাড়ীটা ভাঁজ করে তাহেরের গায়ে দিলাম। মাঝরাত্রে দেখি শীতে কাতর দুদিকে দুজন আমার গলার কাছে কুঁকড়ে আছে। দুজনের মাথার নীচে আমার দুহাত দিয়ে জড়িয়ে নিলাম। তাতে তিনজনের উষ্ণতা ভাগাভাগি হল। সকালে উঠে দেখি তিনজনেরই সর্বাঙ্গ ওশে ভিজে জবজব। শুধু আরামে শহিদ ভাইএর জ্বর কমেছে। কিন্তু জ্বর এসেছে তাহেরের। এবার কিছুক্ষণ পর থেকে শুরু হল আমার ডায়েরিয়া। বোঝা গেল আগের দিনের খাওয়া থেকে হয়েছে।কারণ পারভীনেরও শুরু হ’ল তাই। তাও সেই অবস্থায় রওনা দিলাম। কিন্তু কতদিনে কিভাবে আগরতলা পৌঁছেছিলাম কিচ্ছু মনে নেই। আগরতলায় পৌঁছে এক ভদ্রলোকের বাড়িতে আশ্রয় পেলাম। তাঁর নাম কি ছিল ঠিক মনে নেই। কদিন সেখানে ছিলাম তাও মনে নেই। তবে পেটের অবস্থা আরো খারাপ হ’ল। টাকাপয়সা হাতে ছিলনা ওষুধ কেনার। আমার একটা ঘড়ি ছিল। তাই বেচে শুধু পথ্যের ব্যবস্থা করা গেল। চিঁড়ে। ভিজিয়ে মণ্ড করে খেলাম। রওনা হলাম কুচবিহারের উদ্দেশ্যে ট্রেনে।
আলিপুরদুয়ার জংশন পৌঁছনোর পর দেখি ট্রেনের কামরায় একটু দূরে আমার দূর সম্পর্কের ভাইপো। সে আমাদের শহরের বাড়িতেই থাকে। আমি তাহেরকে বললাম ওর সঙ্গে কথা বলে বাড়ির খবর নিতে। তাহের এগিয়ে গিয়ে আলাপ জমালো। আমি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ছিলাম ঘোমটা মাথায় তুলে দিয়ে। কিছুক্ষণ বাদে তাহের ফিরে এলো এই খবর নিয়ে যে মেজদা সপরিবারে ঐ বাড়িতে। ঢাকা থেকে ভয়ে চলে এসেছে। ভাবলাম, সেরেছে! এখানেও! কি আপ্যায়ন পাবো কে জানে।
তাহেরের সাথে কথায় কথায় ভাইপো জেনেছে যে সেও ঐ বাড়িতে যাচ্ছে। সে তো উৎফুল্ল। নিউকুচবিহার স্টেশনে নেমে তাহেররা আগে আগে চলল। পেছনে ভাইপো। সবার পেছনে আমি। দিনের আলো নিভে আসছে। আমার কঙ্কালসার শরীরে লালপাড় সাদা শাড়ি। মাথায় ঘোমটা। পেছন থেকে আমি ভাইপোকে নাম ধরে ডাকলাম।
“এই মঈদুল”। নিজের নাম অতর্কিতে শুনে ও ফিরে তাকালো। ততক্ষণে ঘোমটা সরে গেছে। আধো অন্ধকারে প্রায় চেনা একটা মুখ দেখে ও যেন কেমন ভেবলে গেল।
“কিরে চিনতে পারিস না?” কিছুক্ষণ দেখার পর “ফুপুউ!! আপনি বেঁচে আছেন?”
“না। মরে ভূত হয়ে আসচি” দেখি ওর হাতের দুধের ক্যানটা ঠন ঠন আওয়াজ করে কাঁপতে শুরু করেছে। খুব হাসি পেল। ও বুঝলো। দুজনে শব্দ করে হেসে উঠলাম।
তাহেররাও হাসতে লাগলো। “আপনার চেহারা ভূতের মতোই লাগতেছে। এমন চেহারা হইচে কেমন করে। আমরা তো শুনছি আপনি নাই, মারা গেছেন।” মইদুল বলল, “আপনারা আসেন। থানার সামনে দাড়ায়া থাকবেন। আমি বাড়ির অবস্থা বুঝে ডাকবো। নাইলে অন্যব্যবস্থা করবো।” বলে ও তাড়াতাড়ি চলে গেল।অন্য ব্যবস্থা মানে বাবুলদার বাড়ি যিনি আমাকে এই পথের দীক্ষাদাতা।
পরে মইদুল থানার সামনে থেকে আমাদের ডেকে নিয়ে গেল। বাড়িতে কেউ ছিলোনা। সবাই ল্যান্সডাউন হলে ফাংশান দেখতে গেছে। মাঝখানের বড় ঘরে ঢুকলাম। শুধু টেবিলল্যাম্প জ্বলছে। মা বের হয়ে আসলেন। আমাকে দেখে শুধু বললেন, “কিরে, তুই বেঁচে আছিস?” অন্য কোনো বাড়ি হলে দৃশ্যটা অনেক বেশি আবেগাকীর্ণ হত। কিন্তু আমার মা বোধহয় দুঃখ চেপে রাখতে রাখতে অমন বাহ্যিক আবেগ আর দেখাতে পারতেননা। তাঁর মনে কী চলছিল সেটা আজ আমি বুঝতে পারি। কিছুক্ষণ পরে বড়দি ঢুকলেন। ছোড়দা ঢুকলো। বড়দি আমাকে দেখে অজ্ঞানের মতো হয়ে গেলেন। সবার এক কথা, “একি চেহারা হয়েছে তোর!”
অসুখ সারানোর অনেক চেষ্টা বাড়ি থেকে করালো। তাহেরের তো জামাই আদর পাওয়ারই কথা। সবার মন জয় করে ফেলল। সবচেয়ে ভাব তার মেজভাবীর সাথে।
কতদিন থাকলাম? প্রায় মাস দুই। কলকাতা থেকে কয়েকজন এসে যোগ দিলো। আমাদেরকে নিয়ে কলকাতা থেকে বনগাঁ বর্ডার হয়ে ঢুকবে আবার পূর্বপাকিস্তানে।
চলে আসার আগে আমাকে চুড়ি, হার, কানের দুল [দেওয়া হল] আর তাহেরের হাতে উঠলো মায়ের দেওয়া পোখরাজ বসানো আংটি। চুপচাপ নিয়ে নিলাম। আমাদের ভবিষ্যৎ ফাণ্ড।
চলে আসার আগেও কোনো আবেগ প্রকাশিত হয়েছিলো বলে মনে পড়েনা। তবে মায়ের মন কেঁদেছিলো হলপ করে বলতে হবেনা নিশ্চয়।

১২
নিভন্ত এই চুল্লি তবে
একটু আগুন দে—-
হাড়ের শিরায় শিখার মাতন
মরার আনন্দে।
দুপারে দুই রুই কাৎলার
মারণী ফন্দি
বাঁচার আশায় হাত-হাতিয়ার
মৃত্যুতে মন দি’।

[শঙ্খ ঘোষ]
ফিরে যাওয়ার যাত্রা শুরু। কলকাতা থেকে। শামনগরে এক দাদার বাড়িতে কদিন কাটালাম। তাহেরকে দেখালাম জুটমিলের ভেতরে সেই কোয়ার্টার যেখানে আমার জন্ম হয়েছিল। শামনগর থেকে রওনা হলাম বনগাঁর দিকে। তার পরের গন্তব্য কুষ্টিয়া। বনগাঁ পৌঁছে ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম লাশের স্তূপ। সব উদ্বাস্তু যারা প্রাণ বাঁচাতে বাঁচাতে পালিয়ে এসেছিলো এতদূর। উদ্বাস্তু ক্যাম্পে খাদ্যের অভাবে, যদিবা পেয়েছে, খেয়ে সংক্রামিত হয়েছে কলেরায়।
ঐ যে একটা হাত, কারো বা মাথা একটু বেরিয়ে আছে স্তূপের ভিতর থেকে। এদের প্রত্যেকের একটা করে আলাদা মনের জগৎ ছিল। ভয়, প্রেম, লোভ হিংসা কত কি!…. সে যখন নিজের ঘরে জায়গায় ছিল বোঝেনি কখনো তার গুছিয়ে রাখা স্বপ্নের ভবিষ্যৎ এই পরিণতি পাবে। এই পরিণতিতে আসার আগে পর্যন্ত কতরকম পর্যায় পেরোতে হয়েছে তাকে। তারপর, চেতনা শেষ তো সব শেষ। সব রীতিনীতি আচার অনুষ্ঠান সব সবের ইতি। এখন পড়ে আছে থানায় জমা হওয়া ভাঙ্গা গাড়ির স্তুপের মতো। সন্ধ্যায় হয় বড় বড় গর্তে সবাইকে ফেলে মাটিচাপা নয়তো কেরোসিন আর পেট্রোল ঢেলে সবাইকে স্বাহা।
এই সমস্ত মানুষ, নিরীহ মানুষের দল যদি লাশে পরিণত না হয়ে হতে পারতো এক বিদ্রোহের সুগঠিত দেয়াল। প্রতি হাতে যদি জ্বলে উঠতো শুধু একটি করে বিদ্রোহের মশাল, গর্জে উঠতো আগ্নেয়াস্ত্র যথাসময়ে তাহলে অত্যাচারীর বুক ধড়ফড় করে উঠতো না কি? শুধু বেঁচে থাকার জন্য, মৃত্যুর সাথে লুকোচুরি খেলে শেষরক্ষা তো আর হল না। এর জন্য কে দায়ী? আমরা, যারা সঠিক পথ চিনেও তাদেরকে পথটা চেনাতে পারলামনা, সময় পেলাম না আলোর পথের দিশারী হতে। এই মৃতের স্তূপের উপর দিয়ে প্রবঞ্চনার মুখোশের আড়ালে উঠেছে বাংলাদেশ।
আরও কিছু মৃত্যু লিখতে যুগের খাতায়।
বনগাঁ থেকে হেঁটে ঢুকছি যুদ্ধপীড়িত দেশে আমরা ছয় মূর্তি। আর উল্টোদিক থেকে তখন ভীতসন্ত্রস্ত মানুষের ঢল চলেছে ভারতের দিকে। কত মানুষ! কত রকমের মানুষ! বেশভূষায় বোঝা যাচ্ছে এক সচ্ছল পরিবারের কর্তা, দুপাশে দুই নারীর কাঁধে হাতের ভর রেখে কষ্টে হাঁটছেন। তাদের কার কি সম্পর্ক জানার কথা নয়। হয়তো স্ত্রী বা কন্যা বা বোন। আরো অজস্র সাধারণ মানুষ। এরা একসাথে।
কিছু পথ এগোনোর পর দেখি এক মধ্যবয়সী পুরুষ এক বৃদ্ধাকে কাঁখে নিয়ে অতিকষ্টে হেঁটে আসছে। বুঝলাম মা। লোকটির কোমর বেয়ে নামছে পুরীষ। ভ্রূক্ষেপ নেই। চলেছেন তিনি। আরও এগিয়ে যাই। দেখি একটি গাছের নীচে শুয়ে আছে এক অশীতিপর বৃদ্ধ। ভেবেছিলাম মৃতদেহ। কাছে এগিয়ে গেলাম, দেখি ক্ষীণ শ্বাস নিচ্ছেন। জিজ্ঞেস করলাম সাথীরা কই। কোনোরকমে বললেন, “চইলা যাইতে কইছি ছাইরা”
বুঝলাম ভার হতে চান নি শেষমুহূর্তে।
এমনি কোথাও ভরা প্রসূতি পাশের খেতে জন্ম দিয়েছে সন্তানের, আবার কোথাও সদ্যমৃত সন্তানকে উঠোনের চুল্লিতে সমর্পণ করে জীবনের পথে এগিয়ে গিয়েছে মানুষ।
বাকীটা কুকুরের ভাগে।
সম্পর্ক কি তবে? মায়া! মায়ার বাঁধনে যুক্তি দিয়ে বাঁধি? আবার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কেমন সব আলগা হয়ে যায়! এই দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছি উল্টোস্রোতে।
সন্ধ্যা নামে। আমরা গিয়ে পৌঁছোই একটা মাঠে, স্কুলের সামনে। জায়গাটা কি ছিল নাম মনে নেই। গোল হয়ে বসেছি মাঠে। দেখি তিন চারজন লোক এগিয়ে আসছে। আমাদের দেখে জিজ্ঞেস করলো কোথা থেকে আসছি, কোথায় যাবো। এদেরকে বোধহয় বসিয়ে আমাদের পরিচয় মোটামুটি বোঝানো হয়েছিল। তারা বলল সবচেয়ে নিরাপদ শান্তিকমিটির মেম্বারের বাড়ি। লোকগুলো আমাদেরকে তার বাড়ি নিয়ে তুলল। আমাদের আসল পরিচয় কাউকেই দেয়া হয়নি। ওরা এটুকু জেনেছে ভয়ে ভারতে চলে গিয়েছিলাম, আবার ফেরত যাচ্ছি বাড়িতে। বাড়ির কথা বলা হয়েছিল কুষ্টিয়া। আমরা জানতাম শান্তিকমিটির লোকদের কাজ ছিলো পাকবাহিনীর চরের কাজ করা।
রাত নেমেছে। উঠোনে ঢুকে দেখি মোটাসোটা গৃহিণী উঠোনের চুলোয় বড় কড়াই চাপিয়ে দুধ জাল করছেন। ঘরের গাই-এর দুধ। গন্ধে চারপাশ ম ম করছে। দুধের ভক্ত আমি কোনোকালেই নই। শুধু সর খেতে ভালোবাসতাম। মা খাঁটি দুধের সর দিয়ে কলা চিনি দিয়ে ভাত মাখলে হামলে পড়তাম। তার চেয়েও মোটা সর ঐ কড়াইএর দুধের উপর ভাসছিলো। রাতে দুধ ভাত বরাদ্দ হ’ল। কিন্তু আমি একটু সর চেয়ে নিয়ে ভাত মেখে খেলাম।
শোয়ার ব্যাবস্থা হ’ল ছেলেদের জন্য দলিজ ঘরে। আমাদের জন্য বরাদ্দ হ’ল উঠোনের একপাশের একটি ঘরে। সেটার আবার কোনো দরজা বলে পদার্থ নেই। ঘরে মাচার উপর পাতা কাঁথার উপর শুয়ে পড়লাম। পায়ের দিকে দরজার উল্টোদিকে একটা বড় সিন্দুক ছিলো। তার ওপরেও বিছানা পাতা ছিল। কিছু পরে দেখি বাড়ির কর্তা এসে ঐ সিন্দুকের উপর বসলেন। আমরা দুজনেই উঠে বসেছি। একজন অন্য মানুষের সামনে শুয়ে থাকা ভালো দেখায়না। ভদ্রলোক নির্বিকার ভাবে বললেন, “শুয়ে পড়, শুয়ে পড়। কোনো ভয় নাই।” শুয়ে তো পড়লাম। খুব অস্বস্তি হচ্ছিলো। মনের ভেতরটা কেমন খচ খচ করতে লাগলো। এই সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে ঘুম ভাঙলো। নির্বিঘ্নে কেটেছে রাত। বুঝলাম দরোজাহীন ঘরে তিনি পাহারায় ছিলেন। পান্তাভাত খেয়ে বেরোলাম পথে কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে।
কুষ্টিয়া পৌঁছে পলাশের বাড়িতে পৌছলাম। ওখান থেকে গোয়ালন্দ ঘাট পেরিয়ে বাসে করে ঢাকা।
পথে বিভিন্ন জায়গায় বাস থামিয়ে ছেলেদেরকে নামানো হচ্ছে। খান সেনারা তল্লাশি করছে। বাইরে থেকে দেখে ওরা বুঝতে পারছেনা অন্তরে বয়ে নিয়ে যাচ্ছি স্বাধীনতা যুদ্ধের আকাঙ্খার আগ্নেয়াস্ত্র। তারা বুঝলোনা ভিড়ে লুকিয়ে এগিয়ে চলেছে একদল মুক্তিকামী সৈনিক।
ফেরিতে একজন খানসেনা বলল, “আপকা উও ব্যাগ দিখাইয়ে” আমি হ্যান্ডব্যাগটা এগিয়ে দিতেই বলে উঠলো, “নেই, নেই। খুদ খোলকর দিখাইয়ে।” খুলে দেখালাম। একটাও যদি চিহ্ন দেখতে পেতো ভারতের, ভয়ানক কাণ্ড ঘটে যেতে পারতো।
ঢাকায় পৌঁছলাম। বাসাটা বোধহয় লালমাটিয়ায় ছিল। সকলের সঙ্গে আবার মিলিত হলাম। ভাইয়া , আপা অন্য সব সাথীদের সাথে।

১৩
শিকড়, ব্যথিত শিরা, মানুষের অতল উৎসার
এর ওর মুখে এতো ভাঙা ছবি সাজিয়ে রেখেছ।
জানোনা আমিও ঠিক সেইভাবে চেয়েছি তোমাকে
মাটিতে আঙুল দিয়ে খুঁড়ে ধরে যেভাবে এ বট।
#
এখানেই ছিলে তুমি? এইখানে ছিলে একদিন?
ছুঁয়ে দেখি লাল মাটি, কান পেতে শুনি শালবন
সমস্ত রাত্রির প্রেত সঙ্গে নিয়ে ঘুরি, আর দেখি
তোমার শরীর নেই, তোমার আত্মাও আজ ঢেকে গেছে ঘাসে।
#
আমি কি মৃত্যুর চেয়ে ছোটো হয়ে ছিলাম সেদিন?
আমি কি সৃষ্টির দিকে দুয়ার রাখিনি খুলে কাল?
ছিলনা কি শষ্পদল আঙুলে আঙুলে?তবে কেন
হীনতম অপব্যয়ে ফেলে রেখে গেছ এইখানে?

[শঙ্খ ঘোষ]
করাচী চলে যাবার আগে তাহেরের আম্মা আব্বা আমাদের সাথে দেখা করেছিলেন।
আম্মা বললেন তাহেরকে, “বেটা, চল আমাদের সাথে। আমরা যাচ্ছি। তোকে এখানে ফেলে কি করে যাব?” সমানে কেঁদে চলেছেন। তাহের বলল, “তা হয়না আম্মা। আমার কাজ ফেলে কি করে যাব? এ দেশেই থাকতে হবে আমাকে।” আম্মা ডুকরে কেঁদে উঠলেন। “আমাদের চেয়ে তোর কাজ বেশি হল?” তাহের চুপ করে থেকে তার দৃঢ় সংকল্প জানিয়ে দিল। এবার আম্মা আমাকে আঁকড়ে ধরলেন। তাহের আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ও গেলে ওকে নিয়ে যাও।” আম্মা যেন খড়কুটো পেলেন অথৈ জলে। তাহেরের কথায় আমি ক্ষুণ্ণ হলাম। আম্মা আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “হাঁ, সহি বাত। তুম চলো হমারে সাথ। অগর তুম যাওগে, তো উওভি পিছে আ যায়েগা।”
মনে মনে বললাম, “আপনি তাহলে পুত্রটিকে চিনতে পারেননি।”
বললাম তাহেরকে, “আগে আমি সংগঠনের সদস্য হয়ে এসেছি, পরে তোমার বউ হয়েছি। কাজেই যেতে হয় তুমি যেতে পার। সংগঠনের সদস্য হিসেবে আমার স্বাধীন সত্ত্বা আছে।” তাহেরের চোখে নীরব গর্ব ফুটে উঠতে দেখলাম।
আম্মা রেগে গেলেন। কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকলেন, এই সব করে আমরা হৃদয়হীন হয়ে গেছি। তিনি ভগ্নপ্রাণ, ভগ্নহৃদয় নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। যতদিন বেঁচে ছিলেন, প্রতি নমাজে ছেলের ফিরে যাওয়ার জন্য মোনাজাত করতেন। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি বিশ্বাস করেন নি তাঁর ছেলে আর কখনও ফিরবেনা।
ভারত থেকে ফিরে আসার পর ভাইয়া আপার সাথে একনং বাসায় কদিন ছিলাম। তখনো সেরে উঠিনি ভালো করে ক্রনিক অ্যামিবিক ডিসেন্ট্রি থেকে। পরে অন্য বাসায় স্থান হল আমাদের। অন্য সাথিদের সাথে।
দীর্ঘ রোগভোগে আমি শরীরে মনে দূর্বল হয়ে পড়েছি। তাহেরকে এক মুহূর্তের জন্য ছাড়তে পারিনা। ভয়ংকর অসহায় মনে হয় নিজেকে। হয়তো এটা কোনো মানসিক রোগে পরিণত হয়েছিল। ওদিকে তাহেরকে পাকাপাকিভাবে একনং বাসায় চলে যেতে হল। এই নিয়ে খুব মনোমালিন্য হতে লাগলো। কান্নাকাটি করতাম। একদম বিপ্লবীদের মানসিকতার উল্টো। ভয়ঙ্কর স্খলন।
পরে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে গেছি। মাও সে তুং এর চিন্তাধারা পড়ছি। বাসার অন্য সাথিদের জামাকাপড় ধোয়া, রান্না করা, ঘরের অন্যন্য কাজের মধ্যে ডুবে গেলাম।
মাও এর শিক্ষা, যে যতই সামান্য গুরুত্বের কাজ করুক না কেন সেটাই নিষ্ঠার সাথে পালন করতে হবে। কারণ একটা বড় যন্ত্রের শরীরে একটা ছোট্ট নাটবল্টুরও গুরুত্ব অনেক।
তাহেরের অনুমতি নেই আমার সাথে দেখা করার বা কথা বলার।
একদিন কলঘরে একটা শার্টের কলার ঘষছি। শুনলাম সে এসেছে। ঘরে গিয়ে দেখি টেবিলের ধারে একটা চেয়ারে বসেছে। ঐ মুহূর্তটা স্তব্ধ হয়ে রইলাম। রান্নাঘরে কিছু সেমাই ছিল। জল আর চিনি দিয়ে রান্না করে একটা প্লেটে করে তার সামনে রাখলাম। নিজে গিয়ে দাঁড়ালাম উল্টোদিকের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে। তাকিয়ে আছি দুজনে দুজনের দিকে। চারটি করুণ চোখের মিলন হ’ল। নির্বাক! যেন অনন্তকাল! খেতে খেতেও সে চোখ সরায়নি। আমিও দৃঢ় শান্তভাবে চোখ পেতে রাখলাম তার চোখে।
খাওয়া শেষে উঠে দাঁড়ালো সে। চোখের ভাষা এবার বদলে গেছে। গভীর ভাবে যেন আশ্বস্ত করছে। যেন নির্বাক ভাষায় বলছে, “ভালো থেকো, আবার আসবো ফিরে তোমার কাছে।” মুখে বলল “বাইরে যাচ্ছি কাজে”, বলে চলে গেল।
চলে গেল সে। চিরতরে। আমি ওখানেই স্থাণুর মতো বসে রইলাম। বুকে নতুন আকাঙ্খার ঢেউ নিয়ে। জানলাম না এই চলে যাওয়ার পথ ফেরার পথ চিনবেনা কোনো দিনও।

১৪
তাহের চলে গেছে সাভার ঐক্যফ্রন্টে। প্রায় মাস দুই পার হয়ে গেছে। আমাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে একনং বাসায়, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে। তাহের আর তার সঙ্গীদের কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এমনই বলা হল আমাকে। তারপর একদিন শুনলাম, জানলাম শেষ কথা। তাহের আর নেই। সে নেই। মন তো সদাই প্রস্তুত থাকত যে কেউ এবং নিজেও যে কোনো মুহূর্তে নেই হয়ে যাওয়ার জন্য। তবু মন তো অতটা কঠোর হয়ে উঠতে পারেনি; অতটা নির্বিকার হতে পারিনি তখনো। যা ছিলো অত গভীর, তা কি এত সহজে ভোলা যায়? ভোলার দরকারটাই বা কি? তবু সেই শোক ভোলাতে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হ’ল। ডাক্তার বিস্মিত হলেন, হাসলেন। বললেন “চিকিৎসা যে কার দরকার, সেটাই ভাবার বিষয়।” যাহোক, ওষুধ চলল। কিসের? ভোলার, ভুলে যাওয়ার। এতই সহজ?
সে ওষুধের কাজ যখন শেষ হল, আমি তখন দাঁড়িয়ে এক ধূসর সমুদ্রের এপারে। ওপারে সব আবছা যন্ত্রণার ছবি হাতছানি দিয়ে ডাকছে, ছুঁতে চাইছি প্রাণপণে, পারছিনা, কিছুতেই পারছিনা। মানুষটাকে বিচ্ছিন্ন করা হ’ল, মানুষটা জীবনের ওপারে চলে গেল, তার স্মৃতিও মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা হল। কিন্তু মন। এইখানেতো কেউ জিততে পারেনা। এখানে কারো হুকুম চলেনা।
ভারত থেকে ফিরে আসার পর শুনেছিলাম ততদিনে পেয়ারাবাগান মুক্তাঞ্চলের ঘটনা ঘটে গেছে। বিরাট লড়াই হয়েছে সেখানে। মেয়েরা খুব লড়াই করেছে সেখানে। শ্রেণীশত্রু খতম করেছে। যারা মেয়েদেরকে খানসেনাদের হাতে তুলে দিচ্ছিল তেমন ঘৃণ্য দালালদের ধরে মেয়েদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তারা ঐ সমস্ত পশুদেরকে বেয়নেট দিয়ে……গুলি খরচ করেনি। শুনেছি এসব আপা ও ভাইয়ার মুখে। খুব আফশোস হয়েছিল, এমন একটা যুদ্ধে শামিল হ’তে পারিনি বলে।
তাহের চলে যাওয়ার পর, আমার একটা আলাদা অবস্থান তৈরী হবারই কথা। আপাতত ছিলাম কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে। বাসায় থাকলে ঘরের কাজই করতে হ’ত আগের মতই। এবার পাঠানো হ’ল ফরিদপুর। একটা রিপোর্ট সংগ্রহ করতে। গেলাম। তখন সেখানে খান সেনাদের অতর্কিত আক্রমণ হচ্ছে গ্রামগুলোতে। তবে বেশিরভাগ বিল বলে সাঁতার না জানা খান সেনারা খুব বেশি কায়দা করতে পারছিল না। গ্রামবাসীকে বিলে বিলে ছোটো নৌকো করে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কিছু জরুরী সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমার সক্রিয়তা দেখে সেখানকার নেতৃত্ব আমাকে পলিটিকাল কমিশাঁর হিসেবে চেয়ে আবেদন করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে। তাতে আমিই অভিযুক্ত হই এই বলে যে আবেদনের জন্য আমি তাদের প্রভাবিত করেছি।
এবার অভিযোগ চেহারার বিরুদ্ধে। বুদ্ধিজীবির ছাপ নষ্ট করতে হবে। যেতে হবে বস্তিতে। আমি মহানন্দে সাদা মোটা থান পরে বিধবার পরিচয়ে আশ্রয় পেলাম এক বস্তির কমরেডের ঘরে। বস্তিটা তৈরী এমন ভাবে, একটা লম্বা দেয়াল ইঁট সিমেন্টে গাঁথা এমাথা থেকে ওমাথা, তার সামনে বাঁশের বেড়া দিয়ে একটা করে খোপ আলাদা করা। তারই মধ্যে সংসার পেতেছে এক একটা পরিবার। মেয়েরা কেউ লোকের বাড়িতে কাজ করে। কেউ সবজিবিক্রেতা। আবার কাগজকুড়োনো ছেলের দল, ভাঙা লোহাটিন সংগ্রহকারী। সবার বাস সেখানে। সামনের লম্বা খোলা জায়গাটুকুন কুটনো কোটা, সান্ধ্য আড্ডা মায় ঝগড়ার উঠোন। হাসি মস্করা, কখনো কাগজ কুড়োতে গিয়ে বোমা ফেটে ভয়ঙ্কর আহত হওয়া সন্তানের জন্য কান্নার রোল সব ঐ উঠোনে। সারাদিন কলকল করছে মহাজীবন স্রোত। মুশকিল শুধু কলঘর আর প্রাতঃকৃত্য সারার জায়গাটা। একটা ছোট্ট ঘেরা জায়গায় মেয়েদের যাবতীয় মেয়েলী কাজ সারতে হয়, সে যতই ব্যক্তিগত হোকনা কেন। আর প্রাতঃকৃত্য? সে তো পুলসেরাতের চুলের তৈরী পুল পেরোনোর পরীক্ষা! একটা পানাভরা খাল। তার প্রায় মধ্যিখানে দুটো পাশাপাশি টিনের তৈরী খোপ। সামনে চটের পর্দা দেয়া। দুটো করে লম্বা বাঁশ ফেলা আছে পাড় থেকে গন্তব্য অব্দি। আর দুখানা দুদিকে রেলিং-এর সাপোর্ট বাঁশ। এইবার বদনা হাতে শরীরের বেগ সম্বরণ করতে করতে ব্যালান্সের খেলা! কে কে দেখবি আয়, বিনিপয়সায়। লাইনে দাঁড়াতে হয় ঐ খেলায় নামার জন্য। অন্দরের পদার্থ যদি বেগবতী হন তবে আর দেখতে হচ্ছেনা, কি কেলো!
এই জীবনে যাঁরা দিনের পর দিন কাটান তাঁদের আমি মহান মানুষ বলি।
এখানে বিদ্রোহের আগুন জ্বালানো যায়, তবে বাইরে থেকে এসে নয়। এদের পেশায় থাকতে হবে দিনের পর দিন। এদের হয়েই মিশে থাকতে হবে। আমার উপস্থিতি তাদেরকে একটু একটু সন্দিহান করে তুলেছে। আমার নাম মহিলারা জিজ্ঞেস না করেই দিয়েছে “সুন্দরী”। আর আমার অনভ্যাস তাদের বুঝতে অসুবিধে হয়নি। হাসির হররা উঠে যায়, গা টেপাটিপি করে মস্করা চলে সময় সময়। এবার কিছু ধান্দাবাজ পুরুষেরাও দেখছি ঘুরঘুর করছে আশেপাশে। এদের কাছ থেকে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো। গুণ্ডা হ’লে তেমন কোনো সমস্যা নয়, ওদের জন্য ঐ জাঁহাবাজ মেয়েগুলোই মনে হয় যথেষ্ট। ভয় হ’ল খোঁচরদের নিয়ে। কমরেডের চোখেও পড়েছে ব্যাপারটা। তিনি উপরে জানালেন।
এর পর আমি তেজকুনি পাড়ায় এক সহানুভূতিশীলের বাড়িতে থেকে কমলাপুর রেলস্টেশনের বস্তিতে কাজের চেষ্টা করলাম।
একদিন রাতে সেখানে কিছু কাগজ পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটা কাণ্ড করলাম। একটা লুঙ্গি পরলাম। শার্ট পরে চাদর দিয়ে মাথা অর্ধেক ঢেকে রাস্তায় বেরোলাম। রাত দশটা। দোকান পাট বন্ধ হয়ে গেছে। গলি দিয়ে চলেছি। একটা চায়ের দোকান থেকে একটা বাচ্চা কর্মচারী বছর বারোর কাজ শেষে বেরিয়ে এলো। আমাকেও ঐ বয়সের ছেলেই লাগছে। গুনগুন করতে করতে লম্বা পা ফেলে চলেছি আমার পক্ষে যতটুকু সাধ্য। ছেলেটা আমার পাশে পাশে হাঁটছে। আমার মুখের দিকে দু’একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল, “হেই, তুই কইহান থাইক্যা আইছস রে? তরে ত আগে দেহি নাই এইহানে?” দুএকবার জিজ্ঞেস করার পর দিলাম ধমক, “দেহস নাই তো দেহস নাই। তর কি রে ব্যাডা? আমি যেইহান থেইক্যা আইছি, আইছি। তর কি? ভাগ এইহান থিক্যা!” ছেলে দেখি চুপচাপ নিজের পথ মাপলো। আমি কমলাপুর স্টেশনের পিছন দিকে চলে এলাম। দিনের বেলায় এখান দিয়ে একাধিকবার পার হয়ে বস্তিতে গেছি। কেউ খেয়াল করার ছিলনা। ওটা প্রোহিবিটেড অঞ্চল। রাতের বেলা যে পাহারার সামনে পড়বো বুঝিনি। ঢুকে যথারীতি পড়তে হ’ল ওদের হাতে।
“হেই ছেমড়া, এইহান দিয়া আইলি ক্যমনে? জানস না এইহানে ঢোকার নিয়ম নাই?”
মনে মনে প্রমাদ গুণলাম। এখন যদি ধরে নিয়ে গিয়ে আবিষ্কার করে আমি মেয়ে তাহলে আর এক কিত্তি। বললাম, (কাঁচুমাচু স্বরে) “বুজি নাই। নতুন আইসি ত। রাস্তা হারাইয়া ফেলসি। ডুইক্যা পরসি এই হানে”। “যাইবি কোনহানে?” “ঐ পারের বস্তিত”।
“ঐ হুন, হ্যারে লইয়া লাইনপারের রাস্তাখান দেহাইয়া ল” বলে এক বুড়োকে সঙ্গে দিল। বস্তিতে পৌঁছে যখন সব কাগজপত্তর ভিতর থেকে বের করলাম, বস্তির ছাউনির স্বল্প আলোয় ওরা চিনে কি হাসির ঝড় সব শুনে।
পরদিন এত মজা করা সব উবে গেল বকুনি খেয়ে স্থানীয় নেতৃত্বের কাছে।
এর পর একটা কংগ্রেস হ’ল। সেই কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে দেখলাম বেশ রদবদল হয়েছে। নেতার চারপাশে যাদের জড়ো করা হয়েছে তাঁরা একদল স্তাবকবৃন্দ। নেতার সমালোচনা করার সাহস তো নেইই, তিনি যা বলেন তাতেই মাথা কাত্। সমালোচনার মনোবৃত্তির অভাব অবশ্য তাহেরের মধ্যেও দেখেছি।
যাই হোক, এই কংগ্রেসের পর আমাকে পাঠানো হ’ল পাহাড়ে। সেখানকার নেতৃত্বের সাংগঠনিক সহকারী রূপে।
——– ————– —————

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.