প্রাণে গান নাই …


চৈত্যপত্রিকার জন্ম শান্তিনিকেতনে, শান্তিনিকেতনের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই চৈত্য-র যাত্রা শুরু হয়েছিল – এবং সে যাত্রা চলছে চলবে। বিজ্ঞানমনস্কতা, এবং শিল্পসাহিত্যের বিচারকে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসার পর্য্যায়ে নিয়ে যাওয়ার মন্ত্র রবীন্দ্রনাথের কাছেই শেখা। চৈত্য এবং চৈত্য থেকেই সম্ভূত WATAN এই কাজটা সাধ্যমত করছে এবং করে যাবে।
.
কিন্তু চৈত্য পত্রিকায় শান্তিনিকেতন নিয়ে বা তার বর্তমান হাল হকিকৎ নিয়ে তেমন কিছু লেখা হয়না, হয়নি এতদিন। বরং আমরা রাজনীতি নিয়ে লিখেছি – বিকৃত হিন্দুত্ত্ববাদ নিয়ে লিখেছি – যে বিকৃতি আজ গ্রাস করেছে সারা দেশকে। বিকৃতমনস্কতা আগেও ছিল – কিন্তু বৃহত্তর রাজনীতির প্রাঙ্গণে তার এই নগ্ন নৃত্য খুব বেশীদিনের নয়। শান্তিনিকেতন ছিল এই বিকৃত ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধেই এক প্রকাণ্ড প্রতিবাদ, এক বিকল্প চেতনা এবং বিকল্প যাপনের আকর। কিন্তু এবার আঘাত আসছে সরাসরি সেই বিকল্পের উপরেই, যাকে আমরা ধ্রুব ভাবছিলাম এতদিন। বাইরে থেকে আঘাত আগেও এসেছে, কবির জীবদ্দশাতেই তার শুরু। ভিতর থেকে আঘাত আসাও শুরু হয়েছে ১৯২৫-২৬ নাগাদ, যে ক্ষোভের প্রকাশ রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্রেও পাওয়া যায়, শান্তিনিকেতন থেকে তাঁর ফোকাস সরে শ্রীনিকেতনের উপরে গিয়ে পড়ে ১৯২৮ সাল নাগাদ। কিন্তু যেহেতু বিকল্পই ধ্রুব তাই কিছু লেখার দরকার নেই এরকম একটা প্রায়-অন্ধবিশ্বাস নিয়ে চলছিল চৈত্যপত্রিকা। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলী সেই বিশ্বাসে চিড় ধরালো। যে বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে শান্তিনিকেতন আদর্শের লড়াই – সেই বাইরের শত্রু যে তলায় তলায় বিশ্বভারতীকেই গ্রাস করছে এটা বোঝা যাচ্ছিল অনেকদিন ধরেই, কিন্তু করে ফেলেছে – সেটা জানতে সময়টা একটু বেশীই লাগলো। রোগ যে আছে, যে রোগের উপসর্গ রক্তপিপাসু রাজনীতিকদের জহর মঞ্চে তোলা, বেদগান চলাকালীন সিটি বাজানো, বা আচার্য্য-র নাম ধরে ডেকে মোদী মোদী বলে চিৎকার করা বা জ্যাস্রিরাম ধ্বনি তোলা – যে রোগের উপসর্গ রামকিঙ্কর বেজের জন্মদিনে তাঁকে বেমালুম ভুলে যাওয়া – সেটা জানার পরে তবে না রোগনির্ণয় – তবে না চিকিৎসা!
.
সুতরাং এবার লিখতে হবে। আত্মবিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেতে আমরা রাজী নই। লিখতে হবে কোন রাখঢাক না করেই। শান্তিনিকেতন মানে শুধু দু’জন নোবেল লরিয়েট নয় (তার মধ্যেও একজনের কাজের সঙ্গে আবার শান্তিনিকেতনের সম্পর্ক খুব ক্ষীণ, আত্মিক সম্পর্ক নেই বললেই চলে), শান্তিনিকেতন মানে গাছের পাশে সেল্‌ফি নয়, শনিবারের হাট থেকে হাতের কাজের খরিদ্দারি নয়, ছুটির দিনে মদ এবং বেলেল্লাপনার হুল্লোড় নয়। শান্তিনিকেতন মানে কতিপয় আশ্রমিকের হাহুতাশ এবং নস্ট্যালজিয়া নয়, যে নস্ট্যালজিয়া প্রায় “পুকুরভরা গরু সিলো, গোয়ালভরা মাস সিলো” অবস্থানে চলে যায় – বরং শান্তিনিকেতন মানে এক যাত্রা, বিকল্পের খোঁজে, সাম্যের খোঁজে; শান্তিনিকেতন মানে শুধু কিছু আইকনোগ্রাফি নয় – এ কথাগুলো আবার নতুন করে বলার দরকার আছে।
.
অ্যাকাডেমিয়া কি করছে সে নিয়ে আমাদের খুব একটা আগ্রহ নেই, এমনিতেই তাদের ভূমিকা খুবই হতাশাজনক এবং তাঁরা খুব স্বাভাবিক কারণেই জনবিচ্ছিন্ন। কিন্তু গুরুদেবের আদর্শ কতিপয় অধ্যাপকের কুক্ষিগত হয়ে থাকাটা অবাঞ্ছিত। তাই আমরা একদিকে চেষ্টা করবো শান্তিনিকেতন আদর্শের ভিত্তিপ্রস্তরগুলিকে খুঁজে বার করার এবং যাচাই করার – যাকে বলা যায় core set of belief বা আরেকটু এগিয়ে deep structure; এবং অন্যদিকে চেষ্টা করবো তার iconography এবং dress code নতুন করে জানার। এই দুয়ের মধ্যে সাযুজ্য না থাকলেই বিপদ। সেই বিপদের মুখোমুখি আমরা। সঙ্গে থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.